সাহিত্য

ভাই! বদ দুয়া দিয়েন না

ভাই! বদ দুয়া দিয়েন না
শাফায়াৎ সাহেবের আজ বড় তাড়াহুড়া। ল্যাব বন্ধ করে বাড়ি ফিরতে হবে। সাবিহা নিশ্চয়ই না খেয়ে বসে আছে এখনো! মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগে মেয়েটার জন্য। জীবনে কতো কষ্ট যে দিলেন তিনি। তবুও কোনদিন একটা টু শব্দ করেনি। রাত ১২ টা একটা পর্যন্ত রাতের বেলা বিভিন্ন কাজে বাহিরে থাকেন, বাচ্চাদেরকে সময় দেন না, এমনকি সাবিহা কোনদিন ভালো শাড়ি পড়লে তাকিয়ে সুন্দর বলার ফুরসৎ পর্যন্ত তার নেই। কিছু করার নেই, কর্তব্যের খাতিরে পরিবারকে অগ্রাহ্য করতেই হয়। ইদানিং বড় জ্বালা হয়েছে তার। একটু দাড়ি রাখেন আর টুপি পড়েন বলে অনেকেই তাকে জামাত পন্থী ভাবেন। অফিসেও বেশ বড় একটা শত্রু গ্রুপ তৈরি হয়েছে তার। সরকারী চাকুরীর এই এক জ্বালা! পুরা ৫ বছর অনেক সমঝে চলেছে কলিগদের। কিন্তু, নির্বাচনের পর বড় বেড়ে গেছে জ্বালাতন। অফিস থেকে বাসায় যাওয়ার পথের পুলিশদের কানেও কীভাবে যেন খবর গেছে। আসতে যেতে কেমন ভয়ঙ্কর দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে যেন! আজ কিন্তু অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু বেশী দেরি ই হয়ে গেছে। রাস্তায় পা দিয়ে দেরীটা আবার উপলব্ধি করলেন তিনি। পুরা এলাকা সুনসান নীরব। এই পৃথিবীতে যেন তিনি আর এই গাছ পালা ছাড়া আর কেউ নেই। হাটতে হাটতে বাস স্টপেজের সামনে এসে দাঁড়ালেন। নাহ। রাস্তায় তেমন কোন বাস ও নেই বাসায় যাওয়ার মতো। আজ কি তাহলে একটু বেশী রাতই করে ফেললেন তিনি! সাবিহা নিশ্চয়ই গাল ফুলিয়ে বসে আছে আজও। আহারে বেচারি এই সাত পাচ ভাবছেন, এমন সময় টহল পুলিশের একটি গাড়ি থামল সামনে। বাংলা পাঁচের মতো মুখ করে গলা বাড়িয়ে তাকিয়ে আছেন এস আই মেহেদি। হ্যা! এটা অফিস কলিগ কালাম সাহেবের শালা। শালা দুলাভাই ২ জনই হারেহারে বজ্জাত। অফিসে আসা যাওয়া আছে তার। রাতে যাওয়ার পথেও তাকে দেখেন। তাই, খুব একটা ভয় পেলেন না শাফায়াৎ সাহেব। - কি শাফায়াৎ ভাই! এতো রাতে এখানে কি? ইবলিশের মতো একটা হাসি দিলো এস আই। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। আজ এই হুযুররে বাগে পাইছে সে। তার দুলাভাইয়ের ঘুষ খাওয়া, টাকা বানানোর পথে এই ব্যাটা অনেক বড় সমস্যা। শাফায়েত সাহেব বললেন- বাসায় যাবো, তাই দাঁড়িয়ে আছি। এস আই মেহেদি পান খাচ্ছিল। চিবুক বেয়ে রস পড়ে এক বিশ্রী অবস্থা। - হে হে হে! দেখি ভাই! ব্যাগটা একটু দেখি! যতবারই কথা বলছে ততবারই পানের পিকের ছিটে মুখে আসছে । কি সৃষ্টি ছাড়া কাণ্ড। মেজাজ গরম হয়ে গেলো শাফায়াৎ সাহেবের। ব্যাগ দিলেন। চেকিং হোল। এবার পকেট হাতড়ানো শুরু হোল। আজ পকেটে তেমন টাকা পয়সা নেই তার। এস আই সহ বাকিদের মুখ কুঁচকে গেলো। হটাত একটা ছোট্ট টেলিফোন বুকের মতো ডাইরি হাতে লাগলো। এস আইয়ের চোখ চকচক করে উঠলো। ডাইরি খুলে দেখল- অনেক রকম কুরআন হাদিস লিখা। - এই যে আপনার সাথে জিহাদি জিনিষ পাতি! কি ভাবছেন? আমরা আর বুঝিনা? - বুঝলে আর কি করার যা করার করেন না। শ্লেষ মেশা উত্তর সাফায়াতের। - উনহ! দেখছ! রাজাকারের তেজ কতো! আরেকজন রাইফেল দিয়ে পায়ে ২ টা বাড়ি মারে। ককিয়ে উঠেন শাফায়াৎ সাহেব। - এই ---------এর পোলা! এক্ষুনি বাসায় কল করে ২০ হাজার টাকা আনতে বল। নাইলে তোরে এমন মামলায় ধুকামু, সারাজিবন লাল ঘরের হাওয়া খাবি। - আমার বাসায় ১০ টাকা আছে নাকি সন্দেহ, ২০ হাজার টাকা তো দূরে থাক। - ওসব বইলা কাজ হবেনা। তাড়াতাড়ি ফোন দে - ভাই, দেখেন! আমার জুতা টা দেখেন, ভাঙ্গা মোবাইলটা দেখেন। আপনার কি মনে হয় আমার কাছে রাত ১ টায় ঝারা দিলেই বিশ হাজার টাকা পাইবেন? - আচ্ছা! ঠিক আছে। ২০ মিনিটের মধ্যে টাকা দিতে পারবো, এমন যায়গায় ফোন লাগা -------- বাচ্চা। শাফায়েত বুঝতে পারলো এদের কাছ থেকে টাকা ছাড়া ছুটা যাবে না। বাসায় ফোন দিলো। সাবিহা ধরল। শাফায়েত সাহেব সব বলে ১০ হাজার টাকা ম্যানেজ করতে বললেন, আর বড় ছেলেকে দিয়ে পাঠাতে বললেন। রাত দেড় টায় আত্মীয় স্বজনদের ঘুম ভাঙ্গিয়ে যায়গায় যায়গায় টাকার জন্য ফোন দিলেন সাবিহা। চোখের পানিতে মোবাইলের নাম্বার ও দেখছেন না তিনি। হক ভাইয়ের কাছ থেকে ৫ হাজার, আর শাফায়েতের এক চাচা দিলেন ৩ হাজার। এতো রাতে এতো গুলো টাকা তো মুখের কথা নয়! ঘরের কোনের বিশাল মাটির ব্যাংকটার দিকে তাকালেন। ছোট ছেলেটা বড় শখ করে জমিয়েছে। সেটাই ভাঙলেন। ২৩৩২ টাকা পাওয়া গেলো ব্যাংক থেকে। ছোট ছেলেকে সকালে কি জবাব দিবেন, কীভাবে তার বুক ফাটা কান্না থামাবেন তা আর ভাবতে পারলেন না তিনি। বড় ছেলেকে দিয়ে পাঠালেন বাবাকে ছুটিয়ে আনতে। পুলিশরা সবাই মিলে বেশ মজা করছে শাফায়াৎ সাহেবকে নিয়ে। একটা মজার খেলা তারা খেলে । সবাইকে সরিয়ে দিয়ে তার পাশের জায়গা ফাঁকা করে, তার দিকে গুলি তাক করে। এতে ব্যাটা বেশ ভালোই ভয় পায়। এরপর ২/ ৪ টা বারি, অশ্রাব্য গালি গালাজ বাবা মা বউ তুলে। শাফায়াৎ সাহেব চাপা স্বভাবের , তাও চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। বড় ছেলে এসে এস আই কে টাকা দেয়। কিন্তু কিছুতেই তারা মানতে চায় না এতো কমে। অনেক কাকুতি মিনতি করে ছেলে। অবশেষে তার পকেট ঘেঁটে ২০০ টাকা পাওয়া যায়। আর কিছুই নেই এদের থেকে নেওয়ার মতো। টাকা পেয়ে খুশী হয়ে ভাগ বুঝে নিতে নিতে এক কনস্টেবল দরদ মাখা কণ্ঠে শাফায়াৎ সাহেবকে সুধায়- ভাই, অনেক কষ্ট দিলাম! বদ দুয়া দিয়েন না ভাই।সরি!  

আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নন।)