মনে যে পড়ে না তা না,মনে তো পড়ে ই। তবে ঐ যে 'চোখ ভিজে যায় জলে' ওরকম উথাল পাথাল আর লাগে না। মন কে মন দিয়ে বুঝাতে পারি।
'বাপের বাড়ির কথাটি ভাবিয়া এলোমেলো করে আঁখি' জসীমউদ্দিন সাহেবের এই কবিতাটা কোথায় আছে জানিনা,তবে আমার অন্তরে গেঁথে আছে লাইনটা সেই ২০০৩ সাল থেকে। স্টেজ পারফরম্যান্স ছিলো কবিতাটার। তখন স্কুল পড়ুয়া আমার অনুভূতি সেরকম নাড়া না দিলেও লাইন গুলো কানে খুব বেজেছিলো।
আজকাল যেদিন বাচ্চাদের বাবার ইফতারের দাওয়াত থাকে,একলা দুই বাচ্চা নিয়ে যখন টেবিলে বসি,মানস পটে বারবার ভেসে উঠে, সেই দিন গুলি। ফতুল্লার একটা গ্রাম এলাকায় থাকতাম তখন,চারপাশে ধানক্ষেত, দূরে দূরে কয়েকটা বাড়ি ছিলো তখন। সন্ধ্যের পর সুনশান নিরবতা। আব্বু প্রায় দিন ই ইফতার বাসায় এসে করতে পারতেন না। আম্মু আমাদের দুই ভাই-বোনকে নিয়ে এরকম একলা টেবিল সাজাতেন। চারিপাশের নিরবতার সাথে লড়াই করে বেঁচে থাকার সেই চেষ্টাটা এখন আমিও করি।
চক্রাকারেই চলছে জীবন।
সংসার মেয়েরাই করে,ঝড় তুফান যাই আসুক সেটাকে সব রকমের ভাংগা থেকে মেয়েটাই ধরে রাখে। কখনো স্ত্রী হয়ে তো কখনো মা হয়ে। এই ধ্রুব সত্যটা সব সময় বিশ্বাসযোগ্য না কিন্তু তবুও সত্য। কিছু সম্পর্কে মানুষ স্বামী-স্ত্রী হয়ে না বাঁচলেও বাবা-মা হয়েই চিরকাল বেঁচে থাকেন। সম্পর্ক টিকে যায়,সময় ও চলেই যায়। কেবল আঘাত গুলো থাকে তরতাজা আজীবন!
সেদিন একটা ফ্যামিলি ইফতার এর দাওয়াত ছিলো। সবাই সদ্য বিবাহিত,নতুন সংসারী। আমিই দুই বাচ্চা নিয়ে ছিলাম। খেয়াল করছিলাম,আলোচনার বিষয় গুলো। ঈদে কয়টা জামা কেনা হলো,বানানো নাকি রেডিমেড! কতো রোজায় বাবার বাড়ি যাওয়া হবে,শ্বশুর বাড়ি কয়দিন থাকা হবে! পড়াশোনা শেষ চাকরির প্রস্তুতি চলছে,স্বামী কতোটা এদিকে সাপোর্টিভ! আইফোনের কতো নাম্বার মডেলটা এখন আসছে, কোনটার ফিচার কেমন! নতুন কোন ফার্নিচার টা বাসার জন্য কেনা হচ্ছে! বাবার বাড়ির সেই আদুরে দিনের গল্প!
খাবি খাচ্ছিলাম খুব। গল্পে তাল মেলাতে পারছিলাম না। অবাক ও হচ্ছিলাম, এমনই কি হবার কথা?! আমার কি এসব নিয়ে কিছুই বলার নেই? কেন নেই? আবার আরেকটা আড্ডায় গিয়ে দেখি,কেবল ই সোশ্যাল মিডিয়ায় চলমান ইস্যু নিয়ে আলোচনা! কে কতোটা এসব ইস্যু নিয়ে জানে সেটার সমাহার। সেখানেও ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম।এতো সময় আর আগ্রহ সোশ্যাল মিডিয়ায় কি দেয়া যায়? একসাথে বসে কি কেবল ই ভার্চুয়াল জগতের আলোচনা করা যায়?
জীবন কোথাও তো থেমে থাকে না। অনলাইন-অফলাইন সব কিছু নিয়েই চলে। কিন্তু কোথাও নিজের জন্য ফুলস্টপ দিতে হবে,প্যারা করতে হবে সেটার কন্ট্রোল নিজের হাতেই থাকা উচিত। সেদিক থেকে ভাবলে,বারবার পেছনের সময়ে ফিরে যাই! অজস্র বার এই কন্ট্রোল বাটন ধরে রাখতে কতো ভাবে হিমশিম খেয়েছি! বহু সম্পর্ক অনলাইনেই সজীব আছে আবার বহু সম্পর্ক অফলাইনে সবুজ আছে।
৮বছরের দাম্পত্য জীবনের আরেকটা শিক্ষা পেয়েছি,বাসার ম্যানেজমেন্ট দেখলেই আন্দাজ করা যায়,পরিবারের সদস্যদের মধ্যকার সম্পর্ক টা কেমন! চাইলেও সংসারটা নিজের মনের মতো সাজানো যায় না,সংসারের বাকি সদস্যদের পারস্পরিক সম্পর্ক টা এখানে অনেক অনেক ভূমিকা রাখে। ঘরের আসবাবপত্র গুলো জানান দেয়,তাদের সাজানোর বিন্যাসে তা জানান দেয়,তাদের ধুলোমলিন কিংবা চকচকে অবস্থান ও জানান দেয় খুব স্বচ্ছতার সাথেই,এই গৃহে পারস্পরিক সম্পর্ক টা আসলে কেমন! ব্যস্ততা বা রুচির তারতম্য এর চাইতেও নিজেদের আত্নার মাধুর্য টা খুব জরুরি। সেটার কম বেশি খুব ভালো ভাবেই প্রকাশ পায়,ঘরের চিত্রে।
#শুকনোপাতার_রাজ্য
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নন।)