উইমেন (সামাজিক,মানসিক,সুবিধা বঞ্চিত নারী)

মা গোশত রানছে আমরা মন ভইরা খাইছি

মা গোশত রানছে আমরা মন ভইরা খাইছি

(দৈনিক নয়াদিগন্ত  পত্রিকায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক নারী পাতা-“নারী” থেকে সংগ্রহীত, তারিখ- ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭)

মা গোশত রানছে আমরা মন ভইরা খাইছি

লতা খানম ইতি

হাশিমা বেগমের বাড়ি মানিকগঞ্জের প্রত্যন্ত দৌলতপুরের একটি গ্রামে। জেলা সদরের কয়েকটি বাসাবাড়িতে ‘বুয়ার’ কাজ করে জীবিকা চলে তার। স্বামী মারা গেছেন বছর পাঁচেক আগে। দু’টি শিশু মেয়ে থাকে গ্রামে, নানীর কাছে। উৎসব বা বিশেষ দিন এলে মেয়েরা তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় থাকে কখন আসবে মা। ঈদুল ফিতরে হাশিমা বেগম গ্রামে গিয়েছিলেন ঈদের দু’দিন আগেই। এবার (ঈদুল আজহা) আর যাওয়া হয়নি। বললেন, ‘আমগোর তো কুরবানি দেওয়ার ক্ষেমতা নাই। বাড়িতে গেলে মাইয়ারা গোশতের লাইগা চাইয়া থাকব। এক টুকরো গোশতের লাইগা রইয়া গেলাম! ঈদের পরদিন গোশত লইয়া বাড়িতে যামু।’
হাশিমা জানালেন, যেসব বাসাবাড়িতে কাজ করেন, এর মধ্যে অর্ধেক বাসার মানুষই গ্রামে চলে গেছেন। যারা আছেন, তাদের কাছ থেকে গোশত পাইছি। কেজি পাঁচেক তো হবেই। ঈদের পরদিন ভোরেই তার এই গোশত নিয়ে বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতা। বাড়ি ফিরবেন, হাঁড়ি ভরে রান্না হবে, বৃদ্ধা মা আর মেয়েরা মনভরে গোশত খাবে। এই সুখকল্পনায় হাশিমার মুখখানি বেশ উজ্জ্বল। এমন অনেক হাশিমা রয়েছেন আমাদের সমাজে, বছরের একটি দিন ঘিরে যাদের ‘এক টুকরো গোশতের’ প্রত্যাশা লালিত হয় সযতেœ।
ঈদের দিন দরিদ্র শিশুরা কেউ কেউ ঘুরে বেড়ায় মানুষের বাড়ি বাড়ি, ঠোঙ্গা অথবা ব্যাগ হাতে। কারো ভাগ্যে এক দু’টুকরো করে গোশত জোটে, কারো জোটে না। বাড়ি বাড়ি ঘুরে এমন অনেকে আছে যারা বাহারি রেসিপির রান্নার গন্ধ পায় কিন্তু তৈরি করা খাবার পায় না। শুধু শিশুরাই নয়, ঈদের দিন অনেক দরিদ্র মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে কোরবানি দেয়া বাড়িতে। বিভিন্ন বাড়ির গেটে ভিড় করে এক টুকরো গোশতের আশায়। দিন শেষে জমানো গোশত নিয়ে বাড়িতে রান্না করে খান পরিবারের সবাইকে নিয়ে।
বছরে যাদের একবারই গরুর গোশত খাওয়ার সুযোগ হয়; আশায় থাকে আশপাশের পাড়া-প্রতিবেশী কিংবা গ্রামের কেউ কোরবানি দেবেন। অপেক্ষা করতে হয় আরেকটি বছরের জন্য। দৌলতপুরের বাঘুটিয়া চরাঞ্চলের হতদরিদ্র পরিবারের আট বছরের শিশু মিতু আক্তারের ঈদুল আজহার অনুভূতিটা এমনÑ ‘আশপাশের গ্রাম ঘুইরা গোশত আনছি। মা রানছে, আমরা মন ভইরা খাইছি।’
আজকাল আমাদের সমাজ সংসারে পবিত্র ধর্মীয় বিশ্বাসের কোরবানির চেয়ে কোরবানিটা সামাজিক জীবনে অনেকের কাছেই বিত্ত-বৈভবের একধরনের প্রদর্শনীও বটে! অনেকে আজকাল উটও কোরবানি দেন! আপনার কোরবানিটা এমন কোনো দরিদ্র স্থানে গিয়ে দেয়া যেতে পারে যেখানে অনেক মানুষের কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য নেই। আপনার কোরবানিটা তেমন একটি গ্রামে দেয়া গেলে এতে সে গ্রামের মানুষেরা অন্তত ঈদের দিন গোশত খেতে পারবে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে যে আনন্দ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে, তা হবে অনেক মূল্যবান এক উপলব্ধি। মহান সৃষ্টিকর্তার আদেশ পালনের। পাবেন তাদের প্রাণের দোয়া। এতে করে আপনার সম্পদ দরিদ্র মানুষের কাছে ধর্মীয় মূল্যবোধের কাজটিও সঠিকভাবে করা যাবে। প্রয়োজনে আপনিও উপস্থিত থাকতে পারেন তেমন আয়োজনের গ্রামে। দেখবেন এতে ঈদের খুশির আনন্দ ছড়িয়ে যাবে সবখানে।
মিন্নো মিয়া গোশত কাটাকুটি করেন। পেশাদার নন, মৌসুমি। বিশেষ করে ঈদুল আজহার সময়। নিজের পশু কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য নেই। অন্যের কোরবানি দেয়া পশুর গোশত কেটে দু-পয়সা পেয়ে থাকেন। কোরবানির ঈদ এলেই মিন্নো মিয়ার মতো মানুষের খুব চাহিদা। সঙ্গে দু’জন সঙ্গীও আছে। তাদের সাথে থাকে চাপাতিসহ গোশত কাটার ধারলো অস্ত্র। তারও ইচ্ছা থাকে নগদ কিছু টাকা আর গোশত নিয়ে গ্রামে ফেরার। আদরের সন্তানদের মুখে গোশত তুলে দেয়া। মিন্নো মিয়ার বাড়ি ঘিওরের রাথুরা এলাকায়। তিনি বলেন, গত বছর কোরবানির ঈদে কাজ করে কেবল টাকাই পেয়েছন। কোরবানিদাতা গোশত দেননি। তাই এবার আগেভাগেই বলে দিয়েছি, টাকা কম বেশি হোক, কিন্তু গোশত দেয়া লাগবে।
কোরবানির গোশত পাওয়ার প্রবল আকাক্সক্ষী মানুষের আরেকটি দল হচ্ছে ছিন্নমূল ভবঘুরে। শহরে যাদের নির্দিষ্ট ঠাঁই-ঠিকানা নেই। যেখানে রাত, সেখানেই কাত। এই দলের একজন সামেলা বেওয়া। বৃদ্ধা এই নারী জানালেন, বাড়ি বাড়ি এক টুকরো করে নিয়ে ভালোই জোটে। তা চার-পাঁচ কেজি তো হয়ই। কিন্তু রেঁধে খাওয়ার মতো সামর্থ্য তো নেই। তিনি বলেন, ‘ও বাবা, রাইন্দা যে খামু, জিনিস পামু কোনে? থাকনের জায়গাই তো নাই!’ তাহলে এই গোশত দিয়ে কী করবেন? সহজ উত্তর, ‘কী আর করমু, বাবা? বেইচ্চা ফালাই! ‘যাগোর গোশত খাওয়ার ইচ্ছা আছে, চাইতে শরম পায়, হেরাই কেনে!’
ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানেই খুশি। আর ঈদুল আজহা হলো আনন্দের পাশাপাশি হালাল পশু কোরবানির ঈদ। এই ঈদে প্রতিটি মুসলমান ঈদের জামাত শেষে হালাল পশু কোরবানি করে থাকেন। তাই কোরবানির গোশত এই ঈদে অসহায়, দরিদ্রসহ সবার জন্যই আনন্দের একটি বিরাট অংশ। পশুর গোশত বিতরণ ও প্রাপ্তির মধ্যে থাকে নানা অনুভূতির আলোড়ন। কোরবানিদাতার প্রত্যাশা থাকে মহান আল্লাহর উদ্দেশে পশু কোরবানি দিয়ে তার সন্তুষ্টি লাভ। গরিব-দুঃখীর আশা থাকে বছরের একটা ক্ষণে একটুখানি টাটকা গোশতের স্বাদ আস্বাদন, যে সুযোগ অন্য সময় তাদের অনেকেরই হয় না।


আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নন।)
সম্পর্কিত ব্লগ