বিবিধ
‘মা’কে বুঝেছি ‘মেয়ে’কে পেয়ে...

অনেকদিন পর আজ এক ফ্রেন্ড্রের সাথে দেখা। সালাম, কুশলাদী বিনিময়ের পর কিছুক্ষণ নিজেদের অতীত দিনগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর পর বর্তমানে এসে দাঁড়াতেই আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়তে শুরু করলো। মন খারাপের রেশ ছড়িয়ে ফ্রেন্ডটি বলল, সংসার তো যেমন তেমন চলে যাচ্ছে কিন্তু সন্তানদের নিয়েই যত অশান্তি। বিশেষ করে ইউরোপের বৈরী পরিবেশে টীনএজ মেয়েকে নিয়ে নিত্য হাবুডুবু খেতে হচ্ছে। মেয়েকে কিছু বোঝেতে যাওয়া এভারেস্ট জয় করার মতো কিছু মনেহয়। আর প্রতিদিনই একাধীক বার এভারেস্ট জয়ের জন্য অভিযাত্রী হতে হয়। মেয়েগুলো কেন এমন হয়? কেন বুঝতে চেষ্টা করে না মাকে? কেন মনেকরে মা তার শত্রু? শত চেষ্টা করেও কেন বোঝানো যায় না কল্যাণ কামনা করাই মায়ের উদ্দেশ্য থাকে? মেয়েদেরকে ঘিরে এমন এক ঝাঁক অভিমানী প্রশ্নমালা মনেহয় বেশির ভাগ মায়ের মনেই থাকে। ঠিক তেমনি মেয়েদের মনেও থাকে এমন একগুচ্ছ অভিমানী শব্দ। মা আর মেয়ের দ্বন্দ্ব শুনলেই আমার চোখের সামনে ছুটতে শুরু করে জেরী আর তার পেছনে তাড়া করতে থাকা টম।“সাম রিলেশনশীপ আর লাইক টম এন্ড জেরী। দে টিচ ইচ আদার,নক ডাউন ইচ আদার,ইরেটেট ইচ আদার,বাট কান্ট লিভ ইচ আদার”। এই টক-ঝাল-মিষ্টি- নোনতা স্বাদের বাণীটি কে লিখেছেন জানি না। তবে যেদিন প্রথম পড়েছিলাম ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল কেন বানীটি আমার আগে অন্য কেউ লিখে ফেললো সেটা ভেবে।
টীনএজে আমাকে দেয়া আম্মুর অনেক উপাধীর মধ্যে একটা ছিল ‘তর্ক কুমারী’। যখন উপাধীটা পেয়েছিলাম তখন অখুশি হলেও এখন বুঝি কতটা পারফেক্ট ছিল উপাধীটা আমার জন্য। অতীতের পানে দৃষ্টি রাখলে উপলব্ধি করি সত্যিই ভয়াবহ রকমের তার্কিক ছিলাম আমি। আমার মনের খাপে ঠিক মতো না বসলে আমাকে দিয়ে সেই কার্য সম্পাদন করাতে ঘাম ছুটে যেত আম্মুর। যদিও বেশির ভাগ সময়ই আম্মু আমাকে বোঝাতে ব্যর্থ হতেন কাজটি কেন আমার জন্য ভালো। যারফলে হয় আমি কাজটি থেকে বিরত থাকতাম, কিংবা করলেও অসন্তোষ নিয়ে করতাম। আম্মুকে ঘিরে একটাই অভিযোগ ছিল সেটি হচ্ছে-“আমাকে একদম বোঝেন না। আমার ভালো লাগা, মন্দ লাগা, ইচ্ছে-অনিচ্ছের কোন মূল্য নেই আম্মুর কাছে।” এই ভাবনা অভিমানের শ্রাবণ হয়ে কত ভিজিয়েছে আমাকে একাকীত্বে। আম্মু প্রায়ই অভিমানের সুরে বলতেন যে, যেদিন তুই মেয়ের মা হবি সেদিন বুঝবি আমাকে। আর তখন তোর এইসব কর্মকান্ডের কথা মনে হলে নিজেই নিজেকে বকে দিতে ইচ্ছে করবে। আমার অবশ্য মোটেই এমন ইচ্ছে করে না। কারণ সেই মুহুর্তগুলো এখন আমার বিনোদনের অতি উত্তম মাধ্যম। তবে নিজেই নিজের দিকে চোখ পাকিয়ে অতি আদুরে গলায় মাঝে মাঝে বলি, ফাজিলের চূড়ান্ত একটা মেয়ে ছিলে তুমি। আর ডায়েরীর পাতায় পাতায় আম্মুকে ঘিরে রচিত ‘ক্ষোভের উপাখ্যান’কে মনেহয় ‘হাসির ঝুড়ি’।
তবে আম্মুর অভিমানী কথাটা প্রায়ই বেজে উঠতো মনে। মাঝে মাঝে ভাবতাম সত্যিই কি মাকে বোঝার জন্য মেয়ের মা হওয়াটা শর্ত? কিন্তু কখনোই খুঁজে পাইনি জবাব। অবশেষে একদিন সেই মুহুর্তটি আমার জীবনেরও এসে গেলো। যেদিন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ রহমাহ স্বরূপ আমি পেয়েছিলাম আমার মেয়েকে। যখন প্রথম ওকে দেখেছিলাম মনে হয়েছিল আকাশের সবগুলো তারা যেন এক সাথে ঝিলমিলিয়ে উঠলো। প্রথম যখন মেয়েকে কোলে নিয়েছিলাম এমন এক উপত্যকায় চলে গিয়েছিলাম যার নাম বোধহয় ‘প্রশান্তি’। ওর দুচোখে চোখ রাখতেই খুঁজে পেয়েছিলাম সেই স্বপ্নপুরী যার অস্তিত্ব এতদিন ছিল শুধুই আমার কল্পনায়। ওর তুলতুলে নরম হাত দিয়ে যেই মুহুর্তে ছুঁয়ে দিয়েছিল আমাকে প্রথম বারের মত... সোঁদা গন্ধে ভরে শিশির কণাদের ঝিরঝির বরষা জাগিয়ে গিয়েছিল সত্ত্বা জুড়ে মাতৃত্বের তৃষ্ণা। মনেআছে প্রথম বার যখন আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে কান্নার ভঙ্গী করেছিলো, মমতার চাদরে জড়িয়ে উষ্ণ ছোঁয়ায় আশ্বস্ত করে বলেছিলাম, কোন ভয় নেই সোনা এই তো মা আছি তোমার কাছে। মায়ের মুখে শোনা ভালোবাসার পরশে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে গিয়েছিল আমার মেয়ে। মেয়েকে জড়িয়ে ধরে আম্মুর দিকে চোখ যেতেই খেয়াল করলাম নিজেকে আড়াল করে মুছে নিচ্ছে চোখের অশ্রুবিন্দু। হুমম...সেদিনই প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম মেয়েকে ঘিরে মায়ের মনের ভালোবাসার নিরবধি ঝর্ণাধারাকে।
নিজ অভিজ্ঞতা থেকে মনেহয়েছে যেসব মিষ্টি জিনিসে একটু লবণের ছিটা পড়লে স্বাদ আরো বেড়ে যায় মা-মেয়ের সম্পর্ক হচ্ছে তেমন ধরণের মিষ্টি বন্ধন। কখনো মা মেয়েকে বোঝে না তো কখনো মেয়ে মাকে,কখনো দৃষ্টিভঙ্গীর পার্থক্যর কারণে মতের অমিল,রুচিবোধের ভিন্নতার কারণে পছন্দের অমিল। আরো কত কি লবণের ছিটা যে পড়ে মা-মেয়ের এই বন্ধনের উপর। কিন্তু তাতে কখনোই বন্ধন ছিড়ে যায় না। যাবেই না কিভাবে মেয়েরা তো মায়েরই অংশ। আর মেয়েরা মায়েরই অংশ বলেই হয়তো মা ভুলে যান যে তার মেয়েটি শুধুই তার মেয়ে নয়। সেই সাথে তার আরেকটি সত্ত্বাও তার আছে। সে একজন নারীও। আর জন্মের পর থেকে নিয়ে নারী হবার সফর পারি দিতে তাকে পেড়োতে হয়-শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যের ধাপ। ঠিক অনেকটা ঋতু বদলের মত। একেক ঋতু যেমন একেক বৈশিষ্ট্য নিয়ে হাজির হয়। বয়সের প্রতিটি ধাপও তেমনি একেক রূপ নিয়ে হাজির হয় সামনে। মা যদি নিজের দিকে ভালো করে তাকান তাহলে অনুভব করতে পারেন তার মেয়ে এখন কোন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। কারণ সেই পথ মাড়িয়েই তাকে ‘কারো মেয়ে’ থেকে ‘কারো মা’ হতে হয়েছে। আবার এটাও ঠিক যে মেয়েরা ভুলে যায় তার মা ‘একজন মা’ হবার সাথে সাথে একজন নারীও। তাই শুধু মা ভেবে নারী হিসেবে মাকে মূল্যায়ন করতে ভুলে যায়।
মা আর মেয়ে দ্বন্দ্বের সমাধান তাই আমার কাছে মনেহয় নারীত্বের মূল্যায়নে। তাই আপ্রাণ চেষ্টা করি সবসময় মায়ের চোখে না দেখে মাঝে মাঝে নিজের কৈশোরের আয়নায় মেয়ের প্রতিচ্ছবি দেখতে। মেয়েকেও বোঝাই তোমার বয়সটা আমিও পেড়িয়ে এসেছি। তাই এইটুকু ভরসা রাখো যে মামণি তোমাকে বুঝবো। কিন্তু কখনোই ভুল বুঝবো না, ইনশাআল্লাহ। আসলে ভালো মা কিংবা ভালো মেয়ে হবার প্রথম শর্তই হচ্ছে একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা করা। একে অন্যের প্রতি বিশ্বাস রাখা। আর মায়ের অভিজ্ঞতা যেহেতু বেশি তাই দায়িত্বও বেশি। জন্মের পর মেয়ের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় মায়ের মমতার চাদরের। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই দুরন্ত শিশুতে রুপান্তরিত মেয়েটির মমতার চাদরের চেয়েও বেশি দরকার হয় এমন একজন সঙ্গীর যে তার দুরন্তপনাকে উপভোগ করবে। হেসে, হাততালি দিয়ে তাকে উৎসাহিত করবে। ঠিক এমনি ভাবেই কখনো বন্ধু, কখনো প্রেরণাময়ী, কখনো সমব্যথী আর কখনো কখনো মা হতে হবে। মমতার চাদরে সর্বক্ষন জড়িয়ে না রেখে সময়ের দাবী মেনে মাকে রূপ বদলে মেয়ের সামনে আসতে হবে। অনেকটা সাত রঙের সংমিশ্রণে রঙধনু হয়ে। এটা অবশ্য একান্তই আমার নিজের ধারণা।
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নন।)