ঢাকা শহরের সবচে অনিশ্চিত যানবাহনের নাম কি? আগেই না বলি, একটু উদাহরণ দিই। কোন যানবাহনটি পেতে আপনার সবচেয়ে কষ্ট হবে? আগের দিন হয়ত কমলাপুর যেতে গিয়ে বুঝেছেন, সবগুলোই মৌচাক যেতে চায়, আর পরেরদিন মৌচাক জিগেস করতেই বুঝবেন আসলে মৌচাক খুবই খারাপ জায়গা, ওখানে গেলে প্রাণ হাতে ফেরা দায়, তাই কেউ নিয়ে যাবে না আপনাকে। যখন একলা ছিলাম, অসংখ্য দিন ইউনিভার্সিটি থেকে বাসা, কিংবা ফ্রেন্ডের বাসা থেকে আশি একশ টাকার ভাড়ার দুরত্ব নির্দ্বিধায় পায়ে হেঁটে চলে আসতাম শুধু এই জিগেস করার যন্ত্রণা এড়াতে। আরও আছে, কোন যানবাহনটিতে উঠতেই চেইন পড়বে? তা ও আবার সবদিন না, যেদিন আপনার সবচে তাড়া, যেদিন আর এক দুই মিনিটের জন্য আপনার ‘লেট’ গোণা হয়ে যাবে, অথবা যেদিন চেইন পড়া রিকশায় বসে উদাস চোখে দেখতে হবে ইউনিভার্সিটির লাল বাসটা অভিমানী স্বজনের মতো ধীর লয়ে চলে যাচ্ছে, চোখের সামনে দিয়ে, হয়তবা যার মধ্যে প্রাণের বান্ধবীটা বসে আপনার মুন্ডুপাত করছে।
জ্বী, ঠিক ধরেছেন, বাহনটির নাম রিকশা। যার চালকদের পায়ের শক্তিতেই এর শক্তি, চালকের ভাবুক মনে এর সহজপ্রাপ্যতা নির্ভর করে। তো যা হোক, এহেন বাহনে করে অফিসে আসা যাওয়া করি প্রায় দুইবছর। সাথে থাকে স্রষ্টার দেয়া এক মহামূল্যবান সম্পদ, দুইজন মানবসন্তান, যারা জন্মসূত্রে আমাকে মা ডাকে। রিকশার অনিশ্চয়তার কথা তো বললাম, বাচ্চাদের কথা কি বলবো? একটা কথা দিয়েই বলা যায় সম্ভবত, আমাদের শিশুরা আল্লাহর কাছ থেকে দেয়া এমন এক গচ্ছিত সম্পদ, যাদেরকে নিয়ে কোন দুইটা ঘন্টা একই রকম যাবে না। ওদের সাথে থাকলে কোনদিন একঘেঁয়েমি আসবে না, জীবনকে কোনদিন পানসে লাগবে না।
বাসার কাজের ব্যস্ততা আছে, অফিসের কাজ আছে, আবার বিকেলে নিজের টুকটাক কাজ, বন্ধুবান্ধব আত্নীয়স্বজনের সাথে সময় কাটানোর ব্যপার আছে, তো সব মিলে বাচ্চাদের সাথে একান্ত সময় বের করা খুব হয়ে ওঠে না। যখন হয়, তখন হয়ত ওরা ঘুমের কোলে। তো, দুই বছর আগেই ঠিক করে নিয়েছিলাম, এই রিকশার সময়টাতেই আমরা নিজেদের সময়টা উপভোগ করব। নিজের ক্লান্তি মাঝে মাঝে এসে হাত পা কন্ঠ আঁকড়ে ধরে, কিন্তু ওরাই আবার যাদুর মত সেসব উড়িয়ে দিয়ে ভালোবাসতে শিখায়। কি করি আমরা রিকশায়?
১। আমাদের কিছু দুয়া আছে, দুই বছরে একটি একটি করে সাতটা দুয়া শেখা হয়েছে এ নিয়ে। আগে একটা একটা শব্দ করে বলতাম, ওরা আমার সাথে বলতো, একদিন আমাকে অবাক করে দিয়ে নিজেরাই এত্তো বড়ো দুয়া বলে ফেলেছে। সেগুলোই এখন প্রতিদিন পড়া হয়, আর নতুন একটা করে শুরু হয়, যদ্দিন না ওদের সেটা মুখস্থ হয়। মাঝে মাঝে নিজেরাই অর্থ জিগেস করে, আমিও বুঝিয়ে দিই। আল্লাহর কাছে হাত পেতে চাওয়া ভালো, আরও ভালো কি চাইছি জেনে চাওয়া।
২। স্কুলে করতে হবে এমন অনেক গুলো ছোট ছোট ‘রিমাইন্ডার’ থাকে, যেগুলো আগের দিন যতই বলি, ঘুম থেকে উঠে সব হারিয়ে যায়। হয়ত আগের দিন পানির বোতল আস্তটাই ভরা ছিলো, টিফিনে হয়ত একটু বাদাম দিয়েছিলাম, শেষ করেনি, সবগুলো কথা গলার কাছে জমিয়ে রাখি, সকালের যাত্রায় বলি।
৩। ফেরার সময় আমার কথা বলার সুযোগ কম। ওদের সারাদিনের গল্পে ঠাসা থাকে সে সময়টা। খুব মনযোগ দিয়ে শুনতে হয়, না হয় পরে বিপদে পড়তে হয়। হয়ত অনিমার গল্প হচ্ছে, আমি যদি বলি, ‘কেন আরিশাও তো তোকে এইটা বলেছিলো সেদিন’, এমন দৃষ্টিতে তাকাবে আমার দিকে, ক্লাসে দুইবার জিরো পাওয়া বাচ্চার দিকেও আমরা এমন করে তাকাই না। ‘আম্মু তুমি এতো বোকা কেন? ওইটাও ত অনিমাই বলেছিলো!’
৪। ফেরার সময় আরেক ধরণের কথা বলতে হয়। চেষ্টা করি খুব কম সময়ে সেরে ফেলতে। সেটা হোল, এখন বাসায় গিয়ে আমরা কে কি করবো সেটার পরিকল্পনা। মাঝে মাঝে বৃষ্টিতে ভেজার প্ল্যান থাকে, কখনও বিকেলে রান্নার ঝামেলা আছে, সে সময়টা ওরা কি করবে সেটা বলি, আবার মাঝে মাঝে ওরা ঘুমাতে চায় না, তাহলে বিকল্প কি করা যায়, অথবা আমার কোন কাজ আছে বাইরে, সে সময়টা কম বিরক্ত করবে কিভাবে, এইসব কথা সেরে ফেলি। মজার ব্যপার হল, বাচ্চারা সেইসব মোটামুটি নিখুঁতভাবে মনে রাখে, আর আমি কাজে ফাঁকি দিলেও লজ্জা দেয়। সবচেয়ে ভালো লাগে, যেদিন নিজের ঘুমায় না, কারণ হয়ত নতুন কোন মুভি আনা হয়েছে বা পরের দিনের হোমওয়ার্ক শেষ, আমার বিশ মিনিটের সংক্ষিপ্ততম ঘুমের সময়টায় মুভি দেখতে দেখতে চারটা এইটুকুন হাত ওদের মায়ের মাথায় গায়ে মায়া বুলিয়ে দেয়, আবার এলার্ম বাজলে ডেকে দেয়।
৫। ওই যে বলছিলাম, রিকশা ভীষণ ঝুঁকির যানবাহন। বৃষ্টি, রোদ, রাস্তায় পানি, পাশ দিয়ে যাওয়া দ্রুতগতির বাইক এসবের কোনোটার মোকাবিলায় কোন নিরাপত্তা নাই রিকশায়। সবচেয়ে ভয় লাগে যখন দেখি কারও কাপড় চাকা ছুঁইছুঁই করে ঝুলছে। নিজের অজান্তেই ডেকে দেখিয়ে দিই। বাচ্চারা কাছ থেকে দেখে ভারি অবাক হয়। কেন বললাম? না বললে কি হোত? এসবের জবাব দিতে গিয়ে গল্প করতে শুরু করলাম নিজেদের চারপাশ নিয়ে। পয়সা না থাকলে কি হয়, কেন পকেটে পয়সা থাকলেও অনেক সময় মানুষ মুখ গোমড়া করে রাখে, কেন নিজের পয়সা অন্য কাউকে দিয়ে দিতে হয়, কেন কোন বিনিময় না পেলেও অনেক সময় অনেক কাজ করি আমরা, মানুষ মরে গেলে তার নিজের কি কি কাজ তাকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়, কি কাজে মানুষের সম্মান বাড়ে, আরও কত গল্প। ওদের মাথা থেকেও মাঝে মাঝে বের হয়ে আসে মারাত্নক মারাত্নক আইডিয়া। ‘আম্মু আমার কেন নিজের টাকা নাই? তাহলে ত আমিও মাঝে মাঝে বাবুগুলাকে একটু টাকা দিতে পারতাম। কী মায়া লাগে, ওরা তো স্কুলেও যায় না। টাকা দিলে একটু খেতে পারতো।’ তো, সেই সমস্যা সমাধানের জন্য আমাকে বাধ্য হয়েই মেয়েকে একটা পার্ট টাইম চাকুরী দিতে হল, ঠিক হল ও নিজে পড়তে বসার সময় ভাইকে নিয়ে বসবে, আর খাবার সময় নিজের সাথে সাথে ভাইকেও দ্রুত খেতে বলবে। মাস শেষে নিজের টাকাই থাকবে ওর হাতে, যাকে ইচ্ছা দিতে পারবে। মহাখুশী মেয়েটা এখন অন্য লিস্ট করছে, ফ্লাইওভারের নিচে বসে থাকা বুড়োটার জন্য একটা রুটি কিনবে, এই গল্পও সময় নিয়ে শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে যাচ্ছে বাসার বাকিদের।
বাচ্চাদের আমরা একটা দুয়া শিখাই, নিজেরাও পড়ি। চোখে ভেসে আসে নিজেদের বাবামায়ের ক্লান্ত মায়াবী মুখগুলো। বলি, ‘আল্লাহ আমাদের যেমন ছোটবেলায় দেখে রেখেছেন তাঁরা, তাঁদেরও দেখে রাখেন, সেইভাবেই’।
দিন বদলেছে, আমরা বাবামায়েরা আজকালের বাচ্চাদের দেখে রাখছি, ওদের বড় করার কারিগরের কাজ করছি। নিজেরা ওদের কাছ থেকে দুয়া চাই, যেন আল্লাহ আমাদেরকে তেমনভাবে দেখে রাখেন, যেমন আমরা ওদের রাখছি। তাই, বাচ্চাদের সাথে কাটানো প্রতিটি দিন আমার জীবনে অনাগত কোন সুন্দর দিনের হাতছানী দেয় আমাকে। ওরা বড় হোক, সুন্দর মানুষ হোক, রাস্তায় একটা ঢাকনা ছাড়া ম্যনহোল কিংবা ময়লা ছড়ানো ডাস্টবিনও ওদের হাতের ছোঁয়ায় সুন্দর হয়ে যাক। আবার বাসযোগ্য হয়ে উঠুক পৃথিবী, আমার দেশ।
প্রথম পর্বঃ https://goo.gl/DjQvnp
দ্বিতীয় পর্বঃ https://goo.gl/DvBCNe
তৃতীয় পর্বঃ https://goo.gl/2iRBmC
চতুর্থ পর্বঃ https://goo.gl/YCEdJm
ষষ্ঠ পর্বঃ https://bit.ly/2JTBiOR
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নন।)