বিবিধ

র‍্যাগ ডে পালনের অসুস্হ সংস্কৃতি ও কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাব্যবস্হা নিশ্চিতকরনে ব্যর্থতা

র‍্যাগ ডে পালনের অসুস্হ সংস্কৃতি ও কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাব্যবস্হা নিশ্চিতকরনে ব্যর্থতা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে র‍্যাগডে পালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, বর্তমানে অধযাপনায়রত আছেন,তাদের ভাষ্যমতে- এক থেকে দেড় যুগ আগেও, এ দিবসটি তেমনভাবে প্রচলিত ছিলো না। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে আলাদা উদ্যোগে র‍্যাগডে করা হয়। একাডেমিক শিক্ষাবছরের শেষে, শিক্ষার্থীরা হৈ-হুল্লোড়, রং মেখে, উচ্চ বিটে মিউজিক বাজিয়ে শোভাযাত্রা করে শিক্ষাজীবন শেষ করেন।কতো অদ্ভূতই না অনাহুত সংস্কৃতি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন/প্রবীণ শিক্ষার্থী,বর্তমানে অধ্যাপনারত প্রবীন শিক্ষক মহোদয় দেড়যুগ আগেও এমন সংস্কৃতির সাথে পরিচিত ছিলেন না।১৯২১সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্নে, যে মহান উদ্দেশ্য নিয়ে এ বিদ্যাপীঠের জন্ম, তার সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যশীল।বাংলাদেশের মানুষ বরাবরই নিজেদের ঐতিহয, সংস্কৃতি সযত্নে লালন করে এসেছে।কারো কাছে মাথা নত করেনি।সেখানে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির আদলেই, বিভিন্ন দিবস উদযাপনের কারনে দেশীয় সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য হুমকির পথে।


"Rag" শব্দটি কখনো Clamour, disturb অর্থাৎ গোলমাল করা, অত্যধিক হৈ-হুল্লোড় করা অর্থে ইংরেজীতে ব্যবহৃত হয়। একঅর্থে, Rag Day -কে গোলমালের দিন বা বিরক্তিকর দিন বললে অত্যুক্তি হবে না। কেননা, অধিকাংশ ডিপার্টমেন্ট তাদের র‍্যাগডে তে উচ্চ আওয়াজে মিউজিক বাজিয়ে থাকেন, ক্যাম্পাসের অন্য বিভাগের ক্লাস, পরীক্ষায় যে ক্ষতির কারণ হতে পারে, তার পরোয়া করেন না।

র‍্যাগ ডে'র প্রচলন ঠিক কিভাবে এসেছে জানা যায় না। The Oxford English Dictionary তে আছে, "Rag" is from an act of ragging, esp. an extensive display of noisy disorderly conduct, carried on in defiance of authority or discipline."

১৮৬৪ সালের দিকে উদ্ধৃতটি দেওয়া হয়েছে। যদি ধরে নেওয়াও হয়- ইউরোপ বিশ্ব থেকে এ সংস্কৃতটি বাংলাদেশ, ভারতসহ এশিয়ার কিছু দেশে অনুপ্রবেশ করেছে। কিন্তু বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় পালিত র‍্যাগডে, পাশ্চাত্যে পালিত র‍্যাগ ডে'র চেয়ে ভিন্নখাতে প্রবাহিত হচ্ছে।

Wikipedia' র তথ্যসূত্রে,"Rag day" বলতে,"A day on which university students do silly things for charity, often the culmination of rag week." উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডে অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের জন্য তহবিল সংগ্রহের দিন বিভিন্ন প্যারেড বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান করে থাকে, একে "Rag Day" বোঝানো হয়েছে।

আমাদের দেশে স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ে যে র‍্যাগ ডে'র আয়োজন করা হয়। নিছক হৈ-হুল্লোড়, অর্থহীন আনন্দ লাভের উদ্দেশ্য ছাড়া তেমন মহৎ কিছু অর্জিত হয় না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষার্থীদের থেকে জানা যায়,বিগত সাত-আট বছর পূর্বে র‍্যাগডে উদযাপিত হয়নি। বর্তমানে র‍্যাগ ডে আয়োজনে থাকে কয়েকদিন ব্যাপী প্রস্তুতি। কেককাটা, ফটোশেসন দিয়ে এর শুরু। তারপর, সন্ধ্যারাত পর্যন্ত এর ব্যাপ্তি।


র‍্যাগডে আয়োজনকারীর জন্য,প্রধানত আকর্ষনীয় বিষয় থাকে-
♦ট্রাক-গাড়িতে শোভাযাত্রা, সাউন্ডবক্সে হিন্দি-বাংলা কুরুচিপূর্ণ গানের সাথে উদ্দাম নৃত্য।
♦ছেলে-মেয়ে সহপাঠী পরস্পর রং মাখামাখি যা অনেকটা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির হোলি উৎসবের সমার্থ। সংস্কৃতি চর্চার মানে এই নয় যে, নিজেদের স্বাতন্ত্র্য ত্যাগ করতে হবে!
♦সম্মিলতভাবে নাচ, গান, র্যাম্পসহ, খাওয়া-দাওয়া পর্ব। তবে, অস্বীকার করবো না, কেউ কেউ সৃজনশীল পরিশীলিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকেন, তা হাতেগোনা।
অনলাইনে যেসব র‍্যাগডে এর ভিডিও পাওয়া যায়- তা দেখলেই আশা করি আপনারা অনুধাবন করবেন, এটি কতোটা রুচিকর অনুষ্ঠান হতে পারে।


ঢাবিতে সম্প্রতি আয়োজিত র‍্যাগডে তে ভুক্তভোগী,কয়েকজন বলেছেন,র‍্যাগডে মিছিলে, টিএসসি এলাকা,দোয়েল চত্বর, আশেপাশের রাস্তাগুলোতে সাময়িক অসুবিধা সৃষ্টি হয়।শিক্ষার্থীরা আনন্দ করতেই পারেন,অনেক উদ্যান, অডিটোরিয়াম রয়েছে,তাই বলে অন্যদের সৃষ্টি করবেন কেন?শিক্ষার্থীদের কাছে জাতি এটা আশা করে না।বিরোধীরা বলতে পারেন,বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যা খুশি করা যেতে পারে,কিন্তু উচ্চ বিটে এ শোভাযাত্রায় যেকোন সুস্হ মস্তিষ্কেরনমানুষ অসুস্থ হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় একটি দেশের সংস্কৃতি চর্চার প্রানকেন্দ্র বলা যায়।সুধীমহল নিজেদেরকে সংস্কৃতিবান বলে দাবীও করে থাকেন।কিন্তু, এসব র‍্যাগডে গুলোতে অধিকাংশক্ষেত্রে কুরূচিপূর্ণ,মিউজিকসর্বস্ব হিন্দি গানের আধিক্য লক্ষ্য করা যায়, যেগুলোর অর্থ অনেকক্ষেত্রে মেয়েদের প্রতি যৌনতা সহ অশালীন কথা উপস্থাপন করা হয়েছে এবং যেগুলো যে কোন মেয়ের আত্মসম্মানের পরিপন্থী। নিছক সস্তা বিনোদনের উদ্দেশ্যে এতে গা ভাসিয়ে দেয়া ব্যক্তিত্বসম্পন্ন কারো কাছে আশা করা যায় না

পরবর্তীতে যে বিষয়টির কথা আসলে অসাম্প্রদায়িকতার ধুয়া তোলা হয়,সেটি হচ্ছে র‍্যাগডেতে বড় একটি অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে ছেমেয়েদের পরস্পর রং মাখামাখি।অনলাইনে সার্চ দিলে দেখতে পাবেন কতোটা হাস্যকরভাবে তাদের উপস্থাপন।তারপরও এসব কাদা ছোড়াছুঁড়ির মধ্যে কি আনন্দ থাকতে পারে।,সুস্থ বিবেকবান মাথা কোন উত্তর খুঁজে পায়না।
সন্তানদের পিতামাতার কাছে প্রশ্ন,আপনাদের কাছে সন্তানের এহেন আচরণ কতটা শোভন মনে হয়?আপনিই বা কতটা সমর্থন করেন?
এবার,আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই অতীতের কিছু সুন্দর চর্চার কথা,মনে কি পড়ে স্কুল জীবনের শেষে দশম বা পঞ্চম শ্রেণির বিদায়ী ব্যাচের জন্য আয়োজিত হতো ফেয়ারওয়েল বা বিদায় অনুষ্ঠান
সেখানে বিদায়ী ব্যাচের শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের প্রাণভরা ভালোবাসায় সিক্ত হতে দেখেছি।কতো দিকনির্দেশনা পরামর্শ থাকে,পরবর্তী জীবনের ধাপগুলোতে সহায়ক হয়।আবেগঘন এক মূহুর্তে দাড় করিয়ে দিতো সবাইকে।কিছু প্রতিষ্ঠান দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন হতেও দেখা যায়।অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই হয়ত বিদায় অনুষ্ঠান বা কল্যাণ কামবা করে অনুষ্ঠান হয়,এতে আরো পরিবর্তন আনতে মনোযোগী হওয়া দরকার।কারন,স্নাতক,স্নাতকোত্তর ডিগ্রীলাভ শেষে ক্যারিয়ার, জীবনযুদ্ধে শিক্ষক মহোদয়ের পরামর্শ, দোয়া, পাঞ্জেরীর মতো কাজ করবে।


আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নন।)
সম্পর্কিত ব্লগ