নতুন জামা, নতুন জুতো, মজার মজার খাবার, বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়ানো আর সালামী…… এই শব্দগুলো শুনলে নিঃসন্দেহে চোখের সামনে সকলেরই ভেসে আসবে শৈশবের ঈদ আনন্দ। সময়ের সাথে সাথে জীবনধাঁরা বদলালেও, ঈদের আনন্দ কিন্তু এই শব্দগুলোর মাঝেই ঘুরপাক খাচ্ছে। শিশুদের এই আনন্দগুলো নির্মল, কিন্তু আপনার সন্তানের এই আনন্দ কারো কষ্টের কারণ হচ্ছে না তো? তাও কিনা আপনারই ভুল শিক্ষায়……
সালামি ছাড়া শৈশবের ঈদ আনন্দ ভাবাই যায় না, কিন্তু যেই পায়ে হাত দিয়ে সালাম করা থেকে সালামির উৎপত্তি সেটা যে একেবারেই ইসলাম বহির্ভূত একটি রীতি, তা ইতোমধ্যে আমরা অনেকে জানলেও মানি না। মুখে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলাটাই ইসলামিক রীতি।
সালামি প্রথা ঈদ আনন্দের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও, এই প্রথাটি অনেকের জন্য বেশ ভারি হয়ে যায়। আমি এমন অনেক অভিভাবককে দেখেছি, যারা সন্তান কে সালামির জন্য লেলিয়ে দেয়, রীতি মতো হাত পাতায়…… ‘যাও সালামি চাও’ অথবা ‘চল ঐ বাসায় বেড়াতে যাই, নাহলে সালামি মিস হয়ে যাবে’ এই ধরণের শিক্ষা দিয়ে আপনার সন্তানকে আপনি আসলে কী শিখাচ্ছেন? আপনি কি আদৌ জানেন যার কাছে সন্তানকে পাঠাচ্ছেন সালামি নিতে তার পকেটের জোর কতটুকু? সেই অর্থে আপনি মানুষটিকে বিব্রতকর অবস্থায়ও ফেলছেন। আমাদের সমাজে হাত পেতে চাওয়া মানুষের চাইতে এমন মানুষের সংখ্যাই বেশী যাদের দেখলে আপনি আঁচও করতে পারবেন না, আর্থিক ভাবে তাদের জীবনে কি বয়ে যাচ্ছে। এই ধরণের আত্মীয় হয়তো ঈদে লজ্জায় আপনার বাসায় আসবে না!!! আপনার সন্তানটিকে যেভাবে হাত পেতে সালামি নেওয়াচ্ছেন, তার কাছে আদর, ভালোবাসা, দু'য়ার কোন মর্মই হয়তো থাকবে না, থাকবে শুধু কে কতো সালামি দিচ্ছে সেইটার হিসাব। আমাদের শৈশবের ঈদগুলোতে, সালামির কথা মুখ ফুটে বলা তো দূরে থাক, কেউ দিলেও লজ্জা পেয়ে হাত বাড়াতাম। কেউ যদি খুশি হয়ে আপনার সন্তানকে সালামি দেয়, সেটা ভিন্ন কথা, কিন্তু সালামির জন্য সেধে সেধে হাত না পাতিয়ে, সন্তানকে সেধে সেধে দু'য়া নিতে অভ্যস্ত করান। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিল দেওয়া কিছু কাগজের চাইতে দু'য়ার মূল্য অনেক বেশি এই শিক্ষাটি কিন্তু আমরা আমাদের সন্তানদের দিতে পারি।
অনেক অভিভাবক আছেন যারা ঈদ উপলক্ষে সন্তানদের নতুন জামার সাগরে ডুবিয়ে, জামা কাপড়ের প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দেন। এভাবে আপনার সন্তানকে আপনি যেমন বৈষয়িক করে তুলছেন তেমনি অতিরিক্ত চাহিদা বাড়িয়ে ভবিষ্যতে নিজের কুয়া নিজেই খুঁড়ছেন। জামা কাপড়ের এই অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতা থেকে আপনার সন্তান অহংকার করা ছাড়া আর কিছুই শিখছে না…… বরং সন্তানের ঈদ শপিং-এর অতিরিক্ত বাজেট থেকে কিছু বাজেট কেটে দুঃস্থদের বিলিয়ে দিন এবং সন্তানকেও সেভাবে অভ্যস্ত করুন।
শৈশবের ঈদ আনন্দ হোক নির্মল, সুন্দর, নিষ্পাপ। এই অকৃত্রিম আনন্দটাকে কৃত্রিম করে দিবেন না। পুরো ৩০ দিনের সংযম ও সহিষ্ণুতাকে এক তুড়িতে ঈদের দিন উড়িয়ে দিবেন না।
ঈদের দিন, ভালো পোশাক পরা, ভালো খাবার রান্না করা, আত্মীয়-বন্ধু-প্রতিবেশীর সাথে দেখা করা, এই তো আমাদের রসূলের (সঃ) সুন্নাহ, তাকে বাহ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে অতিরঞ্জিত করবেন না। ঈদের খুশিতে, ঠেলায়, ঘুরতে, এমন কিছুতে নিজেকে এবং সন্তানকে অভ্যস্ত করবেন না যা কিনা অন্যের জন্য কষ্টের কারণ হয়!!!!
পুনশ্চ: লেখা পড়ে যারা আমাকে এক ডিগ্রী বেশি বুঝবেন তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, এখানে সালামি প্রথার মূলোৎপাটন করা হয় নাই, বরং বলা হয়েছে এই প্রথা যেন কারো উপর জুলুম না হয়ে যায়। কেউ সেধে দিলে সেই কথা ভিন্ন। শৈশবের স্মৃতিতে সালামি বেঁচে থাকুক, কিন্তু কারো উপর জুলুম হয়ে না।
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নন।)