কচি লাউ পাতার ডগা গুলো আলাদা করে কেটে নিল মোর্শেদা। ছোট মাছ দিয়ে চচ্চড়ি রান্না করবে ওই ডগা দিয়ে, সাথে দু-একটা আলু ঝুরি করে কেটে দেবে। আর লাউ পাতাগুলো কাচা মরিচ সিদ্ধ, পিয়াজ, লবণ, সরিষার তেল দিয়ে ভর্তা বানাবে।গরম ধোয়া ওঠা ভাতের সাথে এই ভর্তা হলে আর কিছু লাগেই না। মোর্শেদা প্রতিবেলার রান্না প্রতিবেলাতেই করে, হোক শুধুই ভর্তা বা ভাজি। ওর বরটা রশিদ উদ্দিন মোল্লা পাশের গ্রামের মাদ্রাসার শিক্ষক। সে টাটকা খাবার খেতে ভালোবাসে, বাসি হলে কিছু বলে না কিন্তু খায় কম।মোর্শেদা বাড়ির চারপাশটায় অনেক সবজি লাগিয়েছে, সবুজে ভরে থাকে পুরো বাড়ি। একটু পরেই সন্ধা আগলে নেবে চারপাশ। ছেলেটা (মাসুদ) খেল্পতে গেছে স্কুল মাঠে বয়স আট বছর। ছয় বছরের মেয়েটা (মলি) আংগিনায় খেলার সাথীদের নিয়ে খেলছে, আর দেড় বছরের পুচকেটাকে(তুলি) বারান্দায় দোলনায় খেলনা দিয়ে শুইয়ে রেখেছে।মাঝে মাঝে নিজে গিয়ে দেখে আসছে আবার মলিকেও পাঠাচ্ছে।খুব সুখের সংসার মোর্শেদার। সময় হলে নামাজ পড়ে, মাঝে মাঝে নফল ইবাদাতগুলো যত্নের সাথেই আদায় করে।আজো রোজা রেখেছে । ভাতের মাড় গালিয়ে চুলার চারপাশটা পরিষ্কার করে ফেলে। এর মধ্যেই মাসুদ ঘেমে নেয়ে ঘরে ফিরে ছোট বোনটার দোলনার সামনে গেলেই আদুরে সুরে কথা বলে ওঠে মোর্শেদা, -বাজান আগে হাত মুখ ধুইয়া না্ও, তারপরে অরে কোলে নিও। মাসুদ খেয়ালে আসে, -হ মা তাই যাইতাছি, স্যারে কত পড়াইছে এগুলা নিয়া! খালি ভুইল্যা যাই! কথা শেষ করে নিজের মাথায় একটা টোকা দেয় নিজেই। মোর্শেদা মুচকি হাসে। ছেলেটা তার কত যে ভালো এক কথা দু'বার কখনই বলতে হয় না তাকে। বোন দুটোকেই মমতা দিয়ে আগলে রাখে, বড় ভাই বলে কথা।মলির সাথিরাও একে একে চলে গেলে মলিকে নিজেই হাত মুখ ধুইয়ে পায়ে স্যান্ডেল পরিয়ে দিয়ে ছোটটাকে ফিডিং করায় মোর্শেদা। এর মধ্যেই মাগরিবের আজান ভেসে আসে গ্রামের মসজিদ থেকে মাসুদ মায়ের জন্য গ্লাসে করে পানি এনে দেয়। মোর্শেদা প্রসন্ন চিত্তে পানি পান করে ইফতারি হিসেবে। ছেলেটার জন্য মনভরে দোয়া করে, মেয়েরা আর তাদের বাবার জন্যও! মাসুদ মায়ের মুখের সামনে উবু হয়ে বলে, -মা তোমারে ভাত আইনা দেই? ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে মুচকি হাসে, -না থাক, তোমার আব্বাই দুপুরে না খাইয়া গেছে আসুক। মিটসেফের মইধ্যে মুড়কি আছে তুমি আর মলি খাইয়া পড়তে বস। -আইচ্ছা!
গ্রামে কি এক ঝামেলা চলছে। রশিদ উদ্দিন সেই ঝামেলা মেটাতে গেছে, মাদ্রাসা থেকে ফিরেই চলে গেছে।খাবার খায়নি। সেই সকালে খেয়ে মাদ্রাসায় গেছে।মোর্শেদা দুপুরে বেশি জোর করলে বলেছিল, "তুমি রোজা না! আমার চেয়ে তুমি বেশি না খাইয়া আছো! রাতে ফিরে একসাথে খাইয়া নিব।" গ্রামের মোড়লরা এটা নিয়ে অনেক মিটিং করছে, সবাইকে সাবধান করে সতর্ক ভাবে গ্রাম থেকে সিস্টেম করে অন্য কোথাও পাঠিয়ে দিচ্ছে। মোর্শেদাকে কিছু বলেনি রশিদ উদ্দিন এ ব্যাপারে! রাত যখন দশটা ছেলে-মেয়ে গুলো ঘুমাচ্ছে, তখন ও আসেনি রশিদুদ্দিন। নয়টার ভেতরেই ওদেরকে খাইয়ে ঘুমিয়ে দিয়েছে মোর্শেদা। কিন্তু নিজে আর স্থীর থাকতে পারছে না। ক্ষুধা আর ক্লান্তি এসে ঘিরে ফেলেছে। রোজা রেখে সারাদিনের পরিশ্রম আর ছোট মেয়েটাকে ফিডিং করানো সহ খুব কাহিল হয়ে গেছে সে। কিন্তু মরে গেলেও রশিদ উদ্দিন ছাড়া একটা বেলাও খাইয় না। খেতে পারে না গলা দিয়ে নামেই না খাবার। ঠিক সাড়ে দশটায় ফেরে রশিদ উদ্দিন। এসেই মোর্শেদার কপালে চুমু দিয়ে বলে, -আমার রাতের চন্দ্র আর দিনের সুর্য! তোমারে দেখলেই মনে হয় দুনিয়ার সব অশান্তি, দূর অইয়্যা যাইবো! সব বিভেদ আর অনাচার ধংস অইয়্যা যাইব! লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে মোর্শেদার মুখ, কিন্তু দিনিশেষে এই কথাগুলোর অপেক্ষাতেই থাকে মোর্শেদা। এই কথাগুলোই পরবর্তি দিনের সঞ্চয় ওর। হোক একই কথা বারবার! কিন্তু সেই কথাগুলোই শক্তি জোগায় সাহস আর হিম্মত জোগায় দিনিশেষে।রশিদ উদ্দিন কলপাড়ে গেলে মোর্শেদা মুহুর্তেই ভাবে একই কথায় এতো ভালো লাগে ক্যান আমার? উত্তর ও পায়! শক্ত যুক্তি সে উত্তরে, নিজের মনে নিজেকেই বলে "তুই জানিস না আল্লাহ রব্বুল আ'লামীন অন্তরের সবার সব কথা জানেন, তাও মানুষেরে তিনি পাচবার নামাজ পড়তে কইছেন। প্রতি রাকাতে সুরা ফাতেহা পড়তে কইছেন। আর মানুষতো কারোওর মনের খবর জানে না। তাই প্রিয় কিছু কথা সে বারবারই শুনতে চায়।"
হটপটে রাখা গরম খাবারগুলো রশিদ উদ্দিনের প্লেটে বাড়ে, ভর্তা বানিয়ে ফেলে এর মধ্যেই। প্লেটে খুব যত্নে খাবার সাজায়। নিজের প্লেটেও খাবার সাজায় তরকারীর গন্ধে ক্ষুধা আরো বেড়ে যায়........................। কিন্তু বাইরের দরজায় সজোরে আঘাত করছে বেশ কিছু পা। সাথে গুলিও ছুড়ছে।কেপে ওঠে মোর্শেদার হাত, তরকারীর পাতিল উলটে পড়ে যায়।বাইরে কলপাড়ে যায়।এর মধ্যে মিলিটারী ঢুকে গেছে। রশিদ উদ্দিনকে পেয়েই অসংখ্য গুলি করে ঝাঝড়া করে দিল। মোর্শেদার চোখের সামনেই।স্তব্ধ হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে মোর্শেদা। ছেলেমেয়ে সব জেগে গেছে মাসুদের কোলে তুলি, পাশেই আতংকগ্রস্থ মলি দাড়িয়ে। শেষ একটা বাক্য বলেছে রশিদ উদ্দিন, মোর্শেদার কানে ঢুকেছে, ঢুকেছে মাসুদের কানেও। সেটা হল "মোর্শেদা আল্লাহর দোহায় লাগে বাচ্চাগো লইয়া পালাও, আমার লাশের চিন্তা কইরো না।" মোর্শেদা ছন্নছাড়া চেহারায় কেবলই ঘরমুখো হয়েছে, ওমনি পিশাচগুলো মোর্শেদাকে নিয়ে আদিম আনন্দে মেতে উঠলো। মাসুদ এবার বাবার কথাটুকু মনে করে মাকে ফেলেই অন্ধকারে বোন দুটোকে নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। ওদিকে আরশ কাপছে এক একটি চিতকারে! #Stop_genociDe_rOhinga_muslim
আপনার মতামত দিন:
(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নন।)