অনির্ধারিত

আড়িয়াল বিলের জলে মুগ্ধতার একটা দিন

আড়িয়াল বিলের জলে মুগ্ধতার একটা দিন

যাবো যাবো করে অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয়না। বড়বেলার ঈদ যেমন, কীভাবে চলে যায় টের পাওয়া যায়না। ছুটি বাকি আর একদিন। রাতের বেলায় কথায় কথায় ঠিক হলো কোথাও যাবো। সিলভিয়াপু ফ্রি আছেন, তানজিমাপুকে জিজ্ঞেস করতেই বললেন, "I am never busy to meet with you!" <3 তো এবার প্লেস ঠিক করার দায়িত্ব পড়লো আমার উপর। যতই সাজেশন চাই, তারা দিতে রাজি না, বললেন তুমি ঠিক করো। যেখানে নিবা সেখানে, তবে অফার সীমিত সময়ের জন্যে! :)

Image may contain: cloud, sky, outdoor, nature and water

কোথাও যাওয়ার জন্যে প্রথম প্রায়োরিটি থাকে একটু সবুজে হারিয়ে যাওয়া আর নৌকায় ঘুরা। নিজে জানিনা সাঁতার, তাদের জিজ্ঞেস করলাম জানেন তো? পড়ে টড়ে গেল উঠাবেন?  কিন্তু উত্তর হতাশাজনক পাওয়া গেলো। :(

যাই হোক, ঠিক হলো জায়গা একটা, নদী আর গ্রাম ঘুরে দেখবো। আর যাকে যাকে বলার আপুরা বলবে, আমি যাওয়ার ব্যাপারে ইনফরমেশন নিবো। সকালে ১০ টায় সবাই গুলিস্তান থাকবে এই কথায় রাতের কনভারসেশন শেষ হলো।

৮ টার দিকে সিলভিয়াপুকে ফোন দিয়ে বললাম, আপু এই জায়গায় না যেয়ে অন্য কোথাও যাই? আপু আপত্তি নেই জানালো, বাকি তানজিমাপুরে জিজ্ঞেস করা সেই রাজি। আর ৩ জনের কোন আপত্তি নাই নিশ্চিত করলেন আপু।

যাই হোক, গুলিস্তানে যেখান থেকে বাস ছাড়বে বলে ইনফো পেয়েছি, তানজিমাপু জানালেন বাস আসলে ওখান থেকে ছাড়েনা। গুলিস্তান মোড়ে যেতে বললেন। আপু আর আমি যখন কাউন্টারে বাকি ৪ জন তখনো পথে। টিকেট কাটবো কিনা সেই দ্বিধায় টিকেট কাটলাম এই ভরসায় যে বাস ১০ মিনিটের মধ্যে ছাড়বে বললেও ছাড়বেনা আসলে। :P

আপু আর আমি বাসে উঠে সিট নিয়ে নিলাম এমনভাবে যেন কেউ চুরি করে নিবে। :D তো, বাস ছাড়লো ১১ঃ০৮ এ৷ ম্যাপ অন করে নিলাম, নামবো বেজগাঁও। বাস বাবুবাজার পার হওয়ার পর চারদিক সব একই লাগে। -_- ধু ধু বালু আর মরুভুমির মত চারপাশে আর তার মাঝে বিভিন্ন হাউজিং প্রজেক্টের ছোট ছোট সাইনবোর্ড দেখেও বুঝার উপায় নাই কোন পর্যন্ত আসছি।
বেজগাঁও পৌঁছেছি সম্ভবত ১২ঃ৩০ এর দিকে। নেমে অটো রিজার্ভ করলাম গাদিঘাট পর্যন্ত। অটো তার নিজস্ব গতিতে রাস্তার সকল খানাখন্দ টের পাইয়ে ঘাটে পৌঁছালো যখন ১২ঃ৫০।

এদিকে সবাই চা'য়ে ডুব দেয়ার জন্য মুখিয়ে আছে। ঠিক হলো এখন বিলে না যেয়ে একটু রোদ কমলে যাবো। রাস্তা ধরে কিছুটা যেয়ে পছন্দমত দোকান একটা পেয়ে গেলাম। দোকানে বসা লোকজন বের হয়ে বেশ যত্নে বসতে দিলেন। দোকানের মালিক বয়স্ক এক আংকেল। সাদা চাপ দাড়িতে মায়ামুখ। খুব আদরে মামনি ডেকে চা দিলেন। জানালেন অর্ডার করলে দুপুরের জন্য ইলিশ ভাজা আর ভর্তা করে দিবেন। যেহেতু বাসা থেকে খাবার নিয়ে গেছি, জানালাম খাওয়া হচ্ছেনা এখানে। বললেন এখানে বসে খেয়ে যেয়ো তোমরা তবে। :) ওনার ইলিশের কথায় মনে পড়লো, যে বাসে গিয়েছি সেটার নামও ইলিশ। :D

আংকেল জানালেন এখনি কথা বলে না রাখলে পরে ট্রলার/ নৌকা পাওয়া যাবেনা।

ঘাট একেবারে ফাঁকা, ২ টা ট্রলার বাঁধা। যেকোন হালের ক্রেজের মত স্পটে একদমই মাছের বাজার টাইপ না। বিলেও শুনশান৷ যাই হোক, ২ ঘন্টার জন্যে ট্রলার ভাড়া করে উঠে পড়লাম ৬ জন। :)

মাঝি ট্রলার বাজারের দিকে ঘুরায়ে চিপ্স কিনে দিলো আমাদের। এরপর বিলের ভেতরের দিকে যাওয়ার পালা। ট্রলার কোনদিকে যাচ্ছে ঠাওর করা কঠিন, সেদিকে কারো মনোযোগও নাই অবশ্য। আশেপাশের টলোমলো পরিষ্কার জলে আকাশের প্রতিচ্ছবি আর সবুজের ছায়া দেখতেই ব্যস্ত সবাই।

আপুদের কখনো ট্রলারের মাথায়, কখনো পানিতে পা ডুবিয়ে উচ্ছাস আমারও নৌকা বা ট্রলার জাতীয় যানের ভয় উধাও করে দিলো। আপুর গেস্ট দু'জন চুপচাপ হয়ে বসে আছে, অবস্থান জানান না দিয়ে। সামিরা বরাবর ভদ্র বাচ্চা, উঠে সবাইকে ঘুরে ঘুরে চিপ্স আর কেক সার্ভ করলো। :)


যেদিকটায় তখন আছি, দূরে শাপলা দেখা যাচ্ছে। তানজিমাপুকে শাপলা চাই কিনা জিজ্ঞেস করতেই চোখমুখ ঝিলিক দিয়ে উঠলো। মাঝি ভাইকে জিজ্ঞেস করতেই নিয়ে গেলেন শাপলার ধারে। কিন্তু বরাবরের মতই সুন্দর আর ফুটন্ত শাপলা নাগালের বাইরে। এদিকে তার তো ফুটন্ত শাপলা চাই। :D হঠাৎ করে ঝপাৎ করে পানিতে কিছু একটা পড়লো। পেছনে চেয়ে দেখি মাঝিই একজন ঝাপ দিসে। এবং এনে দিলো আরাধ্য সেই শাপলা ;)

মাথার উপর প্রচন্ডরকম রোদ, ছাউনি কাজে দিচ্ছেনা। অবশ্য কারো সেদিকে খুব একটা ভ্রুক্ষেপ নেই। মাঝি ছায়ামত একটা জায়গা দেখে ট্রলার থামালেন, এখানে ঠান্ডা বাতাস পাওয়া যাবে বলে। :) কিছুক্ষণ মৃদুমন্দ বাতাসে থেকে সিলভিয়াপু ভিডিও শ্যুট করা শুরু করলেন যারা আসেনি তাদের স্মরণে। কেউ একজন পাখির গান থেকে হঠাৎ "নয়ন তোমারে পায়না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে" গুনগুন করে উঠলেন রাহনুমাপুর জন্য। <3

সাড়ে তিনটার দিকে ঘাটে পৌঁছাতে সম্মতি পাওয়া গেলো এখন কেউ ফিরতে চায়না। একটু গ্রাম ঘুরে দেখা যাক তবে। চা'য়ের দোকানের আংকেলের সূত্র ধরেই সেই রাস্তা ধরে গ্রামের দিকে যেতে থাকলাম।


মেঠোপথ, রাস্তার দু'পাশে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় গাছের সারি। এমন ছবির মতন পথে হাটতে হাটতে পাশে হাত ধরে রাখা মানুষটার মনে পরলো রাহনুমাপু থাকলে আপুর হাত ধরে হাটা হতো এখানে। মুস'আব তানজিমাপুর জরায়ে ধরা ঐ ছাগলটা জরায়ে ধরতে চাইতো। :(

কোথাও যেন একটা মোরগ ডেকে উঠলো কখন, সিলভিয়াপু তার স্বভাবসুলভ ভাবে সবাইকে আগলে রাখার ঢংয়ে বললেন এই দু'আ কবুলের সময়ে যে যার দু'আ করে নাও। যে যার দু'আ খুঁজতেই, আপু দু'আ করলেন "এই ভালোবাসাগুলো" যেন এভাবেই বেঁচে থাকে।" <3 নিরাপদে ফেরার দু'আটাও করে নিলাম। :) ওহ! বলে রাখা ভালো, ঘাটের ছোট দোকানগুলোর পাশে টিউবওয়েল পাওয়া গেলো একটা। এই গরমে টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানি পেয়ে সবাই যেন সজীব হয়ে উঠলো। উল্টো পাশের দোকানে বলার আগেই গ্লাস এগিয়ে দিলো পানি খাওয়ার সুবিধার্থে। :)  

অনেকটা হেটে পাড়ি দেয়ার পর ছায়ামত একটা জায়গা দেখে এখানে বসে বিশ্রাম আর খাওয়া সেরে নিবো বলে বসে পড়লাম সবাই। নামাজ আর টুকিটাকি গপ্পো, স্মৃতিচারণ শেষ করে ফেরার পথে রওনা দিলাম একইভাবে। কিন্তু বেজগাঁও এসে যা ধারণা ছিলো তাই সত্য হলো। সব বাস মাওয়া থেকেই পুরো প্যাক হয়ে আসতেছে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোন বাসে সিট পাওয়া গেলোনা। :(

যেহেতু ছুটির শেষ দিন, অপেক্ষা করাও বুদ্ধিমানের কাজ মনে হলোনা। অগত্যা লেগুনা চেপেই বাবুবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।

বাসে রাস্তার বেহাল দশা যেটুকু টের পাওয়া বাকি ছিলো সেগুলো সব হাড়ে হাড়ে জানান দিচ্ছে এই যান, তার রোলার কোস্টার ফ্লেভারের সাথে। কিছুটা স্মুদ রাস্তায় এসে যখন ভাবলাম এই বুঝি হাড়গোরের হিসেব নেয়া যায় সব ঠিকঠাক আছে কিনা! হেল্পার জানান দিলো, সবাই যেন শক্ত করে ধরে বসি, সামনে রাস্তা খারাপ। হাসবো না কাঁদবো পরিস্থিতিতে সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করে এই বলে আলহামদুলিল্লাহ পড়লাম, ফিরছি তো সবাই একসাথে। :)

তো, এই বিপদের বন্ধু গন্তব্যে পৌঁছুতে সেখান থেকে আবার যার যার ঠিকানায় যাবার পালা। বিভিন্ন জন বিভিন্ন দিকের রিকশা নিয়ে আজকের মত বিদায় জানিয়ে রওনা দিলো আবার এমন একটি স্মৃতির প্রত্যাশায়। :)


আপনার মতামত দিন:

(মন্তব্য পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নন।)
লেখকের অন্যান্য ব্লগ সবগুলো দেখুন