চিত্রল বার্লিন
লিখেছেন Jummy Nahdia, জুন 23, 2018 7:29 পূর্বাহ্ণ

বার্লিনের সাথে আমার পরিচয় খুব সামান্যই ছিল। শহর বা রাজধানী হিসেবে তো নয়ই, ব্যাক্তির নাম হিসেবে। লুসিয়া বার্লিন নামের মোটামুটি অখ্যাত এক লেখকের নাম আমার বাবার লাইব্রেরীর কোথাও পড়ে ছিল তখন। আবার নাম ভুলে যাওয়া কোন ছিন্নমূল শিশু বার্লিনের রাস্তায় কষ্ট নিয়ে হেঁটে যেত এরকম অনুবাদ গল্প শৈশবের শীতলপাটিতে বসে পড়েছিলাম;মনে পড়ে।

দ্বৈত জীবনের একদম শুরুর দিকে। দুই দরজা বিশিষ্ট পঙ্খীরাজ একটা ছিল আমাদের। পেছনের সিটে বসতে হলে একটু চ্যাপ্টা হয়ে ঢুকতে হত। মধ্য গ্রীষ্মের একদিন দুপুরবেলা সেই পঙ্খীরাজ আমাদের হামবুর্গ টু বার্লিন উড়িয়ে নিয়ে গেল। উড়িয়ে নিয়ে গেল বললাম, কারণ চালক মাঝে মাঝে হাইওয়ের ওপর রেসিং কার গেম খেলতে পছন্দ করছিল।

অটোবানের (হাইওয়ে) দুই দিকে অসংখ্য উইন্ডমিল বাতাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল। আর এই অকারণ উড্ডয়ন উৎপাদন করছিল ভীতি। বেশী স্পিডে গাড়ি চালানো ড্রাইভার আমার দুই চক্ষের বিষ, তাদের আমি দেখতে পারিনা এই তথ্য দেয়ার পরও একেক সময় মনে হচ্ছিল রাস্তার দুই ইঞ্চি ওপর দিয়ে আমরা যাচ্ছি।

আমার অভিজ্ঞতা বলে, ড্রাইভার হিসেবে যে যত দক্ষ, তাকে তত মূর্তিমান বৃক্ষের ভূমিকায় নামতে হয়। তার হিসেবে সে নিয়ম মেনেই চলছে। আমার হিসেবে নিয়মের আরও সংশোধন হওয়া উচিৎ তাহলে। সিঙ্গেল থেকে হুট করে ডাবল ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ার কারণে স্পিড, পাশে বসা বৃক্ষের অবিচলতা দুটোই দ্বিগুণ লেগেছে।

এই সমস্ত কূটতর্কের অবকাশে দেয়ালে দেয়ালে কত রঙের কত কী আঁকা বর্ণিল মহানগরীটি আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে ফেলল।

                        ইন্টারনেট থেকে পাওয়া রঙিন দেয়াল

বার্লিনের প্রথম হাসিমুখ

স্বাভাবিক নিয়মেই বার্লিনে এমব্যাসি, টুকটাক সেমিনার, গেস্টদের দেখাতে নিয়ে যাওয়া ধরণের কারণে অনেকবার যেতে হয়েছে। তবে প্রথমবার বেঞ্জামিন ও যারা নামের দুই আধা বার্লিনার আধা ফেনী শিশুদের বাসা ছিল আমাদের গন্তব্য। প্রথম বার্লিন অভিজ্ঞতা ওদেরকে সাথে নিয়েই তাই। প্রধান ফটকের পর একটা গোলাপ -গোলাপ বাগান পার হয়ে আসতে আসতে সদর দরজায় থেকে সম্ভাষণ পেলাম।

-আসসালামু আলাইকুম আন্ঠি, বালো আসেন?

ওদের মা জার্মান এবং রিভার্টেড। হাসিমুখে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, বালো আসেন বাবী? পুরোদস্তুর জার্মান গড়নের একজন মায়ের হাত ধরে ইলাস্ট্রেটেড হ্যান্সেল অ্যান্ড গ্রেটেলের মত দুই বাংলা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাসিমুখ । লিরিসিস্ট বলেছে হাসিমুখ হাসিমুখে আনন্দধারা। সদ্য বাংলা ছেড়ে আসা আমি বালো না থেকে কই যাবো!

পৃথিবীর দুই অঞ্চলের দুটি সভ্যতার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা পরিবারটির আতিথিয়তায় মুগ্ধ হলাম। সকলে মিলে একটু পর পর এটা ওটা লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করছে এবং অবশ্যই বাংলায়।

´´আপনি কি একটু বাত নিতে পসন্দ করবেন? আপনি কি পানি পান করতে সান?´´

ভাল লাগলো এটা দেখে যে এদের বাংলা কখনো কখনো আমার বাংলার চাইতে অর্থবহ। আমি পানি খাব বললে বাচ্চা দুইটাই হিহি করে হাসে। আরে! পানি কি মানুষ দাঁত দিয়ে এসেন (খায়) করে নাকি? পানি তো মানুষ ট্রিংকেন (পান) করে! কঠিন যুক্তির কাছে আন্ঠি পরাহত।

পরবর্তীতে পরাহত হয়েছি অত্যাধুনিক ফ্ল্যাটবাসা, আইগেন হাউজের পাশাপাশি বার্লিনের অ্যান্টিক অ্যান্টিক বাসস্থান দেখেও। সিলিং এইই উঁচুতে আর জানালার পরিধিও আমার দেখা স্বাভাবিকের চেয়ে বিরাট। বাসাবাড়ির কামরাগুলো এত বড় ছিল; কিছু বাসায় দেখলাম পার্টিশন দিয়ে একটিকে প্রশস্ত তিনটিতেও রূপান্তর করা হয়েছে।

আমি মনে হল একটু মিনিম্যালিজম পছন্দ করি। ক্লামযি না,কিন্তু কম্প্যাক্ট। এত বড় জানালা পরিষ্কার করতে করতেই সব সময় চলে যাবে, আকাশ দেখব কখন?

বিকেলে এক ছিন্নমূল শিশুর সংগ্রামমুখর নগরীতে নিজেকে খোঁজার জন্য পথে বেরিয়েছি। বাচ্চাদুটো আর তাদের পরিবার সাথে আছে। বাস স্ট্যান্ড যাব আমরা। রাস্তা পার হবার সময় যারা ধরে আছে আমার হাত। বেঞ্জামিন অবশ্য এইসব হাত ধরাধরির মধ্যে নেই। বাবা মায়ের মৃদু ধমক চোখ রাঙ্গানি ইত্যাদি উপেক্ষা করে হঠাৎ হঠাৎ কোন কারণে শুন্যে ঝাপ দিতে চাচ্ছে। মাঝরাস্তায় একটা বিপদজনক ডাইভ দেয়ার চেষ্টাকালে গল- বাল্টিক- স্লাভিক গড়নের ভ্রণসঙ্গিনীটি হেঁকে উঠলেন,

ছেলেরে! একবারে মারি হালামু!

উল্লেখ্য, জার্মানদেশের পুলিশ যদি বোঝে যে বাপ মা দুষ্টু ছেলেমেয়ে বশে আনার জন্য এরকম লোকান্তরের হুমকি দিচ্ছে, এর ধারাবাহিকতা খুব একটা প্রীতিকর হয়না। জার্মান পুলিশের ফেনী বোঝার কথা না এই ভাবনা থেকে নেয়া উদ্যোগ দেখলাম মোটামুটি সফল হয়েছে। ছেলে এবার সোজা হয়ে হাঁটছে। আবহমান বাংলার প্যারেন্টিং স্কিল বার্লিন শহরে আমায় মোহিত করেছে।

                                         পুরনো দিনের বার্লিন

পূর্ব পশ্চিম

বার্লিনে ইতিহাস, সভ্যতা, ধবংসের খুঁটিনাটি প্রতিদিনের নাগরিক জীবনের সাথে মিশে থাকে। বাসের হ্যান্ডেল ধরে বিশ্বযুদ্ধ, শীতলযুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধের সামান্যটুকু ফিরে দেখা বেশ উপভোগ্য ছিল। এই একটা শহরের মধ্যে দেয়াল বসিয়ে দেশটাকেই পুঁজিবাদ আর সমাজতন্ত্রের দুই ছাতার নীচে আনার বিষয়ে সাক্ষ্য দেবে বার্লিন দেয়ালের স্মৃতির অংশবিশেষ।

বাস থেকে নামলাম। হাঁটব এখন। আবহাওয়া পরিষ্কার। বিকেলের রোদ বার্লিনের অনন্যসব আধুনিক স্থাপনা অথবা স্মৃতিজাগানিদের জানালায় জানালায় হাসছে। ডিসেন্ট হাসি। উন্মাদনা তেমন নেই।

দেয়ালের কাছে যেতে যেতে ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি এবং ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব জার্মানির কাহিনী অল্প অল্প করে পরিষ্কার হচ্ছিল। পঁয়তাল্লিশের পরে জার্মানির পরাজয়ের পর শান্তিচুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্স -ব্রিটেন-যুক্তরাষ্ট্র মিলে পশ্চিম জার্মানিতে পুঁজিবাদী শাসন ব্যবস্থা প্রসূত প্রবৃদ্ধি আনে। অন্যদিকে পুর্ব জার্মানি সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের অধীনে থাকায় পশ্চিমের চেয়ে ছিল পিছিয়ে। যার ফলে স্বভাবতই শুরু হল বিপুল অভিবাসন। এই অভিবাসন ঠেকাতেই মূলত একষট্টিতে এসে বার্লিনার মাউয়ার এর নির্মাণ। তবে পরবর্তীতে অভিবাসন প্রত্যাশীরা শুরু করল দেয়াল টপকানো। প্রায় দুইশ মানুষের মৃত্যু হয় এই দেয়াল টপকাতে গিয়ে।

                                    সূত্র: ডেইলি মেইল

আবার বানহফ ফ্রিডরিশস্ট্রাসেতে অশ্রুর প্রাসাদ নামের একটা মিউজিয়াম আছে। পূর্ব জার্মানি এই বানহফ বা ট্রেনষ্টেশন দিয়েই তার যত অবাধ্য নাগরিকদের চিরতরে পশ্চিমে পাঠিয়ে দিত। নিয়ম ছিল হয় জেলে যাও নয়তো পশ্চিমে যাও। পশ্চিমে যাওয়াটাই তারা বেছে নিত। তবে এই যাত্রা ছিল বেদনাবিধুর- অশ্রুসিক্ত। আর কোনদিন প্রিয়মুখগুলোকে দেখতে না পাওয়ার যন্ত্রণাপূর্ণ।

ভাগাভাগি কিন্তু ওটাই প্রথম ছিল না। বার্লিনের অধিকাংশই ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলে । সোভিয়েত ইউনিয়নের মনক্ষুণ্ণ করে তবু ১৯৪৮ এ বার্লিনকে আরও চার ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ছিল তখন জোসেফ স্ত্যালিন। এরা বুদ্ধি খাটিয়ে পশ্চিমের দখলকৃত বার্লিনের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করল। আশা করলো যে এতে করে বার্লিনবাসী পর্যাপ্ত খাবার পাবেনা এবং বাধ্য হয়ে সমাজতান্ত্রের আওতায় আসবে। সোভিয়েতের এই অবরোধ এবং ন্যাটোর উৎপত্তি একই সুতোয় বাঁধা বলে মনে করা হয়।

এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ বাকি পরাশক্তিদের কি বুদ্ধি বা স্বার্থ কম নাকি! সমন্বিত পুঁজিবাদ বলে কথা! মার্কিন সামরিক প্রধানের এবং তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হেনরি ট্রুম্যানের মনে হল নতি স্বীকার করলে কমিউনিজম ইউরোপে ছড়িয়ে পড়বে। এটাতো হতে দেয়া যাবেনা। তবে স্বার্থ যাই হোক মানুষের জীবন বেঁচেছিল এটাই বড় কথা। সাধুবাদ তাদের প্রাপ্তি। সড়কপথ,পানিপথ, রেলপথ অবরুদ্ধ হলেও আকাশপথে তো কিছু হয়নাই। তারা তখন সোভিয়েত প্রত্যাশাকে পাত্তা না দিয়ে আকাশ পথে এক বছর ধরে খাদ্য পরিবহন করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন গুলি করে প্লেন নামিয়ে দেয়ার হুমকী দিলেও যুদ্ধক্লান্ত পৃথিবীতে আবারো যুদ্ধের আহ্বান জানানো হয়ে যায় বলে বাস্তবায়ন করেনি ভেবে নিলাম। সোভিয়েতকেও সাধুবাদ।

আকাশপথে খাদ্য ও সামগ্রী পরিবহন পরিক্রমা ইতিহাসে এয়ারলিফটিং হিসেবে পরিচিত। টেম্পেলহফ বিমানবন্দর, বার্লিনের আকাশ এই ঘটনার সাক্ষী। আকাশ থেকে প্রতিদিন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, খাদ্য সামগ্রী ছোড়া হত। খাদ্যের আশায় থাকা বার্লিনবাসী এর নাম দিয়েছিল রোযিনেন বোম্বার বা কিশমিশ বোমা। কিশমিশ বোমারা গতানুগতিক বোমার মত হন্তারক না, তারা মানুষের প্রাণ বাঁচায়। বার্লিনের লুফটব্রুকেনডেঙ্কমাল বা আকাশসেতু স্মৃতিস্তম্ভ এয়ারলিফটিং এর স্মৃতি বহন করছে।

                                             এয়ারলিফটিং

অথচ খুব কষ্ট লাগে চিন্তা করলে, দরকার পরলে বা চাইলেই এরা পারে জীবনের অধিকার নিশ্চিত করতে। সেই ক্ষমতা তাদের আছে। অথচ এরাই যখন চাইবেনা তখন কিরকম সংহারী মূর্তি নিয়ে মঞ্চে আবির্ভূত হয়! দেখছি তো!

দেয়াল প্রসঙ্গে ফিরে যাই আবার। পূর্ব জার্মানি তখন দেয়াল টপকানো ঠেকাতে দেখা মাত্র গুলির আদেশ দিল অবশ্য পরবর্তীতে এই আদেশের বিষয়টা অস্বীকারও করেছিল। তীব্র জনরোষ, অসন্তুষ্টি থেকে জন্ম নেয় লাইপযিশ আন্দোলন। পূর্ব জার্মানির আলেকজান্ডার প্লাতজ থেকে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অগণিত প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলা গণজোয়ার সৃষ্টি করেছিল। আন্দোলনের শুরুতে শ্লোগান ছিল Wir wollen raus বা আমরা বাইরে যেতে চাই। পরবর্তীতে এই শ্লোগান রুপান্তরীত হয় Wir bleiben hier মানে আমরা এখানেই থাকব তে। যেটা দুই জার্মানির ঐক্যেরই প্রাথমিক ইঙ্গিত। কয়েকদিনের টানা বিক্ষোভের পর অবশেষে সেই ঐতিহাসিক ঘোষণা এল। স্রোতের মত হাতুড়ি নিয়ে শাবল নিয়ে পুবের মানুষ যখন দেয়াল ভাঙ্গছে, পশ্চিমের মানুষও সঙ্গতি জানিয়ে সমানে অংশ নিয়েছে। দেয়াল ভাঙ্গা কার্যক্রম ঊননব্বই তে শুরু হলেও পরের বছরে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হল; ভাঙ্গা এবং গড়ার এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপিত হল।

                                       রেখে দেয়া চিহ্ন

ব্যস্ত রাস্তার ওপর মিত্রবাহিনীর সেনা এবং কূটনৈতিক যাতায়াতের জন্য চেক পয়েন্ট চার্লির মিউজিয়াম দাঁড়িয়ে আছে। জীবন্ত রেপ্লিকারা একদম সেই সময়ের কস্টিউম গায়ে দিয়ে সামনে ইউএস- সোভিয়েত পতাকা পেছনে বস্তা (বস্তাগুলোর তাৎপর্য জানিনা) লয়ে সটান দাঁড়িয়ে ছিল। অ্যালিড চেক পয়েন্ট চার্লিতে এসে লোকে সাধারণত গম্ভীর রেপ্লিকাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিজয় চিহ্ন দিয়ে (আবার) হাসিমুখে ছবি তোলে।

                                         অ্যালিড চেক পয়েন্ট চার্লি

(চলবে)

দ্বিতীয় পর্বঃ https://bit.ly/2lvqLO4

শেষ পর্বঃ https://bit.ly/2yzP06W

Facebook Comments
পোস্টটি ১৪৬৮ বার পঠিত
 ১ টি লাইক
২ টি মন্তব্য
২ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. বাস্তবিকতা আর ইতিহাসের মিশেলের মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছি..!!

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment