আমস্ট্যল ডাম থেকে আমস্টারডাম
লিখেছেন Jummy Nahdia, জুলাই 10, 2018 7:27 পূর্বাহ্ণ

ক্যাফেইনে বন্দি

হামবুর্গ জীবনে অভ্যস্ত হওয়ার পাঠ শুরু হয়েছে বেশীদিন হয়নি। তখন বার্লিনে গিয়ে যুক্তরাজ্যের ভিসা নিয়ে আসতে হত। আমার শ্বশুর শাশুড়ি বেলফাস্ট থাকতেন। সরাসরি ফ্লাইট ছিল না ওদিকে সেজন্য মিটফার পদ্ধতিতে আমস্টারডাম রওনা হয়েছি মধ্য এপ্রিলের কোন এক সকালবেলা। মিটফার (mitfahr) হল গাড়ি ভাগাভাগি পদ্ধতি। ইন্টারনেটে বিজ্ঞাপন দিয়ে ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়িতে সিট সাপেক্ষে বাড়তি যাত্রী ওঠানো হয় অনেক সময়। আমরা এক দম্পতিকে পেলাম ছুটি কাটাতে যাচ্ছিল আমস্টারডাম। হামবুর্গ সেন্ট্রাল ষ্টেশন থেকে ওরা আমাদের তুলে নিল।
 
মেয়েটা পেশাগতভাবে ড্রাইভিং ইন্সট্রাক্টর। স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে বলল, ভুল বয়েসে স্থাপত্যবিদ্যার প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল। জার্মান শিক্ষাব্যবস্থা অনুযায়ী ওরা দশ থেকে তের বছর বয়স থেকেই শিক্ষার্থীদের আলাদা করে ফেলে। কারা ভবিষ্যতে একাডেমিক ক্যারিয়ারের দিকে যাবে, কারা বুদ্ধিবৃত্তিক বিভিন্ন বিভাগে পড়াশোনা করবে বা পেশা বেছে নেবে আবার কারা বিভিন্ন কর্মমুখী প্রশিক্ষণ নিয়ে কাজে নিয়োজিত হবে।
 
এই প্রক্রিয়া তার ভাল লাগেনা। এটা ঠিক যে প্রাথমিক ক্লাসের ধারাবাহিকভাবে ভাল করা ছেলেমেয়েগুলোকে বেছে নেয়া হয় বলে তারা মোটামুটি অল্প ঝুঁকিতে কাজের বা গবেষণার দুনিয়ায় সহজে জায়গা করে নিতে পারে কিন্তু ক্লাস এইট নাইনে উঠে যদি কোন শিক্ষার্থীর মেডিক্যাল সায়েন্সের সাথে ভাল বন্ধুত্ব হয়ে যায়, তবু সে সেই বিষয়ে প্রচলিত পদ্ধতিতে পড়ার সুযোগ পাবেনা।
 
মেয়েটির যেমন ভুল বয়সে স্থাপত্যবিদ্যার প্রতি আগ্রহ জন্মেছিল। ততদিনে শ্রেনী বিভাজন সম্পন্ন হয়ে গিয়েছে। গণিত জ্যামিতির অলিগলি সূত্র নিয়ে অন্য কোন পথের দেখা হয়ত পাবে কখনো, আপাতত এই গতির জীবন নিয়ে বেশ আছে।

সাড়ে চার ঘণ্টার রাস্তা সে নানারকম গল্প করতে করতে একাই চালিয়েছে। ওর হিপ্পী ঘরানার সঙ্গীটি চুপচাপ। একগাদা বই নিয়ে গাড়িতে বসেছে। গরম কফি এবং বই দুইটাই সমানে গিলছিল। কয়েক দফা গাড়ি থামিয়েছে শুধু কফি কেনার জন্য। ক্যাফেইনের ঘ্রাণ আমি জানিনা কেন খুব কড়া লাগত। আর গাড়িতে কোন কারণে আমি বইয়ের অক্ষরও অস্পষ্ট দেখতাম।  তিতকুটে কষটে গন্ধ থেকে পালাতে সেই যে চোখ বন্ধ করলাম!

মাঝে একবার দুইবার চোখ খুলে ব্রেমেনের হাইওয়ে দেখেছি, আমার সঙ্গী দুই ডিজিটের মহাসমুদ্রে সাঁতার কাটছিল। আরও দেখলাম ইন্সট্রাক্টর মেয়েটা বুঁদ হয়ে গাড়ি চালাচ্ছে আর হিপ্পী সাহেব ক্যাফেইনের খনি শেষ করছে।

সুতীব্র মাথা ব্যথায় আমি সানগ্লাস চোখে দিলাম আবছায়া ঘুম নামাতে। ক্যাফেইন নামের কোন কিছুর অস্তিত্ব ভুলে থাকার চেষ্টাও করছিলাম। ভাবার চেষ্টা করছিলাম আমার প্রিয় কোন পানিয় নিয়ে। এই মুহূর্তে সেটা কী লেবুর শরবত, ট্যাং নাকি মাঠা? বাতাবী লেবুর ঘ্রাণ নেয়ার চেষ্টা করলাম কল্পনায়। কোথেকে একটা কাঠবিড়ালি এসে পেয়ারা গাছ বাইতে শুরু করল। বাতাবী নেবু একলাই নুলো ডুবিয়ে খাওয়ার অপবাদ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য সে পেয়ারা গাছ নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত  ব্যস্ততা দেখাচ্ছে! এর ভেতর উইন্ডমিলের লম্বা লম্বা পাখা ঘুরছিল ধীরে। অয়োময় নাটকের কাপড়ের পাখার চেয়েও ধীরে। ধীর লয়ে ঘোরা পাখা এবং কাঠবিড়ালির লাফালাফির বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়ায় ক্লান্ত হয়ে আমি অবশেষে ঘুমিয়ে পড়লাম।

ঘুম ভাঙলে দেখি সীমান্ত পার হয়ে গিয়েছি। সমান বিছানো মাঠের পর মাঠ জুড়ে বেশ কিছু গবাদি পশু চরছে। তাগড়া জোয়ান গরুগুলো মন দিয়ে সবুজ ঘাসে মুখ ডুবিয়ে আছে দৃশ্যটা বেশ আরাম আরাম। আমি সানগ্লাস খুলে ফেললাম। মাথা ধরার ব্যপারটা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম কিন্তু সামনে তাকিয়ে দেখি হিপ্পী ভাইয়ের টইটম্বুর কফির কাপ থেকে বুনকো বুনকো ধোঁয়া বের হচ্ছে। এই নির্দোষ বিষয়ে কোন আইন নেই, থাকা ঠিক ও না। নিরুপায় আমি বলতেও পারছিনা যে এত কফি খায়না, এই গন্ধ ভাইয়া আজকাল সহ্য করতে পারিনা।

ওলন্দাজদের ব্যস্ত শহরে দ্রুত পৌঁছাতে হবে। পৌঁছাতে হবে আমস্ট্যল নদীর বাঁধে। এর আগে সম্ভবত মুক্তি নেই।

রেলেরগাড়ি রাজারবাড়ি

শতবর্ষী এক রাজার বাসার সামনে সার বাঁধা বাস, স্বচ্ছ দেয়ালের বাস ষ্টেশন। সেখানে willkommen পথের বিবর্তনে হয়ে গেল welkom, eingang হল invoeren, ausgang বুঝলাম uitgang লেখা দেখে, পোস্টার সাটা সিনেমার বিজ্ঞাপনে লেখা bioscoop শব্দটা মনে ধরল। এই প্রাচীন রাজবাড়িই নাকি ওলন্দাজদের সেন্ট্রাল ষ্টেশন। এর ভেতরেই অত্যাধুনিক ট্রেনগুলো সব তীব্রগতি নিয়ে ছুটে আসে, বিশ্রাম নেয়, আবার ছোটে।

কফিহোলিক ভাইয়া আর ভালো গাড়িচালক ভাবীর সাথে অর্থনৈতিক লেনদেন চুকালাম, চ্যুজ বললাম। কয়েকঘণ্টা জিম্মি থাকার পর অবশেষে তুমুল রাজপথের ঘ্রাণ পেলাম । আমাদের ফ্লাইট সাত ঘণ্টা পর। হাতে কিছু সময় নিয়েই মিটফার সাব্যস্ত করেছি যাতে আনা ফ্রাঙ্কের দীর্ঘশ্বাস মিশে থাকা দেশটাকে একটু পড়া যায়।

সেন্ট্রাল স্টেশন নামক রাজপ্রাসাদের ভেতর ঢুকে পড়লাম। এত বিশ্বজনীন রাজপ্রাসাদ আগে দেখিনি। দুনিয়ার সব দেশের প্রতিনিধি যেন হেঁটে যাচ্ছে। আশপাশ থেকে ব্রিটিশ/ আমেরিকান এক্সেন্ট যেমন ভেসে আসছে, কিছু `ওলা! কমো এস্ত্যাস` শুনলাম। শুনলাম দাস্তার মাথায় দেয়া একজন শিখ পাজির চিন্তিত গলায় `মুবাইল ত্যায় মিসকালান মারডা` ধরণের কিছু বাণী। আর আমরা বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা নিজ ভাষায় বগরবগর করতে করতে স্টেশনের অন্যপ্রান্তে যাচ্ছি।  শুনেছি আমস্টারডামের বিখ্যাত নৌ বন্দরটি ট্রেন স্টেশনের পেছনের দিকে আছে। গন্তব্য সেদিকে।

                                                    সেন্ট্রাল ষ্টেশন, আমস্টারডাম

পায়ের পাতায় ফোস্কা

হারবারের আশেপাশে ভিড়তে পারিনি তার আগেই পায়ের পাতায় ফোস্কা। বড় লেখকদের পায়ের তলায় শর্ষে থাকে, কারো থাকে খড়ম। আমি পাঠক আমার পায়ে শুধুই ফোস্কা। নতুন কেনা ব্যালেরিনা জুতোদের বিশ্বাস করে ভুল করেছি। বাড়তি স্যান্ডেল জোড়াও রেখে এলাম শেষ মুহূর্তে, ওজন সঙ্কট। নতুন কেনার প্রস্তাব পেয়ে বাতাসে দিলাম উড়িয়ে। একেকটি নতুন জুতো, একেকটি বিশ্রী ফোস্কা। আর কেনাকাটায় আমার বড় আলসেমী লাগে। খালি পায়ে কতক্ষণ হাঁটলে ঠিক হয়ে যাবে। এই বেলা ঠাণ্ডাও জোরালো লাগছেনা। শুরু হল আমার থেকে থেকে মুক্ত পদব্রজে হীরক রাজার দেশে অভিযান।

আমস্টারডাম শহরে চক্কর দেবে সিটি সার্কেল ট্যুর বাস। টিকেট কেটে সোজা ছাদবিহীন দোতালায় দৌড়। সকালের দিকে আকাশে রোদ থাকলেও এখন তুলিতে আঁকা কাজল মেঘ। বৃষ্টিহীন বাতাসে উড়ছি যেন। হারবারকে ঘিরে থাকা উৎফুল্ল গাংচীলের অনুভূতি কেমন বুঝি আমি। ওরা আমার মতন ভাবে।

হারবারের গল্প; গল্প থেকে আরও গল্প

নৌ বন্দর ঘেঁষে যাচ্ছিল আমাদের বাস। পানির ওপর ভেসে আছে অতীত এবং বর্তমান দুটোই। ইয়োরোপের সবচেয়ে বড় এনার্জি পোর্ট ক্লাস্টার হচ্ছে আমস্টারডাম- রটারডাম- এন্টওয়ার্প । নেদারল্যান্ড এবং বেলজিয়ামের এই সমন্বিত নৌ পথটি তেল এবং রাসায়নিক শক্তি পরিবহনের জন্য পৃথিবী বিখ্যাত। ছোট বড় নৌ যান চলছে কখনো যাত্রী নিয়ে, কখনো বড় বড় কনটেইনার নিয়ে। আবার থেমে আছে কোথাও। হারবারের বর্তমান মুগ্ধ হবার মত।
 
থেমে থাকার অনেকগুলোই আবার অতীতের স্মৃতিচারণের জন্য রেখে দেয়া। সেই স্মৃতি সাহসিকতার নিদর্শন হলেও শোষণের অমোচনীয় চিহ্ন অনুভব করা যাবে। প্রাচীন মডেলের পাটাতন- মাস্তুলগুলোতে যত্নের ছাপ স্পষ্ট।
                                              পুরনো জাহাজ
ওলন্দাজ নাবিকেরা তাদের স্বর্ণসময়ে সাগরের আনাচে কানাচে জাহাজে চড়ে দাপিয়ে বেড়াতো। ইয়োরোপের উপকূলবর্তী বাণিজ্যের মূল শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পেরেছিল। পুরো দুনিয়ায় ছড়িয়েছিল তাদের উপনিবেশ। নিজেদের এই শ্রীবৃদ্ধির অন্তরালে আছে সুবিশাল অন্ধকার অধ্যায়। নির্মম দাসবাণিজ্য, বোম্বেটেগিরী এবং চোরাচালানীর আশ্রয় নিয়ে তারা উন্মত্তের মত নিজেদের সমৃদ্ধ করে যাচ্ছিল। ট্রান্স আটলান্টিক উগ্রদাস বাণিজ্যে ওলন্দাজরা পর্তুগীজ, ফ্রেঞ্চ, ব্রিটিশ এবং স্প্যানিশ সহচরদের পাশাপাশি নিজেদের নৌ বন্দর- জাহাজ, সময়- শ্রম- শক্তি বিনিয়োগ করে মূলত মধ্য এবং পশ্চিম আফ্রিকা থেকে বিভিন্ন মেয়াদে জোর করে ধরে আনা দেড় কোটিরও বেশী মানুষগুলোকে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করেছিল। বাধ্য করেছিল তাদের মরে গিয়ে মুক্তি পেতে।
 
আমেরিকার কাছে এরা ট্রায়াঙ্গুলার ভয়্যাজ পদ্ধতিতে মানুষ বিক্রি করত। প্রথমে ডাচরা আমস্টারডাম বন্দর থেকে আফ্রিকান গোল্ড কোস্টে যেত। জাহাজ বোঝাই আফ্রিকান কালো মানুষগুলোকে মালামালের মত ঠেসে ঢোকাতো। ওখানেই সহ্য করতে না বিশ ভাগ মানুষ মরে যেত। পথিমধ্যে সাগরডুবিতে শত শত অসহায় মানুষের মৃত্যু এবং শুধুমাত্র লাইফ বোটে করে কেবিন ক্রুদের পগারপাড় হবার মত সুনিশ্চিত ঘটনাও ঘটতো।
                                    ট্রান্স আটলান্টিক স্লেভারি
 
এরপর তাদের একটা অংশকে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে এনে বিক্রি করে দেয়া হত । শক্তিশালী- দুর্বল, নারী-পুরুষ- শিশু বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ফেলে নির্ধারিত হত জীবনের মূল্য। এরপর আজীবনের জন্য পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অশেষ দুর্ভোগের জীবন বয়ে বেড়াতো ভাগ্যহত মানুষের দল। দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল,সুরিনাম, এবং আরও কিছু অঞ্চলে ছিল ওলন্দাজ উপনিবেশ। ক্রীতদাসদের বাকি অংশকে তারা চরম শ্রমনির্ভর কৃষিকাজে নিয়োগ করত। আখ, কফি, কোকোর পাশাপাশি নীলচাষেও বাধ্য ছিল তারা।
 
জুলুম অব্যাহত রেখে এই মেয়াদে বুদ্ধিমান ডাচরা খালি জাহাজ ভরতি করে চিনি, স্বর্ণ বা তামাক নিয়ে আবার বন্দরে ফিরে গিয়ে তাদের ত্রিকোণ সমুদ্র যাত্রা আপাতত শেষ করত।
 
ওলন্দাজ উপনিবেশের চরম অপশাসনের চিহ্ন লেগে আছে সুরিনাম, ইন্দোনেশিয়ার মত দেশগুলোতে। শতাব্দীর পর শতাব্দী নেদারল্যান্ডের এক চিনি ইন্ডাস্ট্রিই দাঁড়িয়ে ছিল দেশগুলোর মানুষের কাঁধের ওপর দিয়ে। ভারতীয় উপমহাদেশে ছিল ওলন্দাজ কলোনি। বাংলা শোষণ করেও তাই ওলন্দাজরা নিজেদের ভাঁড়ার ভরতে পেরেছিল।
 
১৮৫০ সালে এসে দাসপ্রথা বিলুপ্তের  আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এলেও পুরোপুরি বিলোপ হতে আরও অনেকগুলো বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। ডাচ ন্যাশনাল মনুমেন্ট অব দ্য হিস্ট্রি অব স্লেভারী ২০০২ সালে ডাচ রাজপরিবারের দাপ্তরিক ক্ষমা বা কোন বার্তা ছাড়াই জনসাধারণের জন্য খুলে দেয়া হয়।
 
ডাচদের আরেকটু দুর্নাম গাইতেই হচ্ছে। লেখাটি যখন লিখছিলাম তখন বসনিয়ার স্রেব্রেনিতসা গণহ…র তেইশতম বার্ষিকী চলছে। প্রায় আট হাজার মানুষকে মুসলিম পরিচয়ের কারণে পরিকল্পিতভাবে নির্বিচারে হ… করেছিল সার্ব বাহিনী। বাড়তি হিসেবে জ্বালানো- পোড়ানো, ধ…, নির্যাতন তো ছিলই।
 
                                             গণহ… স্মারক
সে সময় স্রেব্রেনিতসায় ডাচরা ছিল জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীবাহিনী। কিন্তু তারা সার্বিয়ানদের আটকায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইয়োরোপের এই বীভৎস হ…যজ্ঞে নেদারল্যান্ডের এই দায় এড়ানো প্রসঙ্গ ডাচদের ভেঙ্গে পড়া নৈতিকতার দিকে ইঙ্গিত দেয় বলে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান সমালোচনা করেন। এই নিয়ে নেদারল্যান্ড- তুরস্কের সম্পর্কে কিছুটা অবনতি, বেশ কথা কাটাকাটিও হয়েছে।
 
ভূত জাহাজ আর নেমো জাহাজ
 
সপ্তদশ শতাব্দীতে একবার ডাচদের বা ওলন্দাজদের এক অদ্ভুতুড়ে জাহাজ পৃথিবীর কোথাও নোঙ্গর করেনি, আবার ফিরেও আসেনি। কিন্তু উনবিংশ এবং বিংশ শতকের অনেক নাবিক `দ্য ফ্লাইং ডাচম্যান`কে সমুদ্রে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে দেখেছে বলে দাবী করে। আমিও কিন্তু এই জাহাজের সমুদ্রে রহস্যজনক আলো ফেলা দেখেছিলাম স্কুবি ডু আর শ্যাগিদের সাথে। দ্য ফ্লাইং ডাচম্যান যদি এই অবেলায় নিজ জন্মভূমিতে এসে একটু দেখা দেয় সেই আশায় ঐ দূরে খুঁজে দেখছিলাম। 
                             
সায়েন্স মিউজিয়াম অব নেমোর বিল্ডিংটা দেখে একটু জোরেই বলা লাগলো, `এটা কি!!`
 

 
                                   নেমো সায়েন্স মিউজিয়াম
 
রেগুলার কোন বাড়ির বা মিউজিয়ামের ডিজাইন না। দূর থেকে দেখে প্রথমে মনে হয়েছিল অত্যাধুনিক কোন জাহাজের সবুজাভ পাটাতন পানিতে অর্ধ ডুবন্ত অবস্থায় আছে। সাদা রঙের সাঁকোটা পার হয়ে বুঝি জাহাজের ডেকে ওঠা লাগে। পরে অডিও গাইড বলল, এটা ইতালিয়ান স্থপতি রেনযো পিয়ানোর নির্মাণশৈলীতে বানানো। পানির ওপর বাইশ মিটার উঁচু এই স্থাপনাটির নীচে আবার একটা টানেলও আছে। ভেতরে কচিকাঁচাদের উপযোগী করে সায়েন্স- টেকনোলোজির অপূর্ব সব প্রদর্শনী। কখনো হাতে কলমে দেখিয়ে দেয়া হচ্ছে, কখনো পর্দায়। মহাবিশ্বের টুকিটাকি, রসায়ন বা গণিতের চমৎকার সব কৌশল এখানে পাওয়া যাবে।
 
রিদমিক প্যাডেল, গ্রাখটেন
 
পানির থেকে চোখ সরিয়ে একটু সড়কের দিকে নজর দেয়া দরকার। চোখ দুটোকে টেনে অন্যপাশে নিতে হল। তবে বেশীক্ষণ ধরে রাখা রাখলোনা, চোখ হাজারে বিজারে সাইকেল দেখে নিজেই ভিরমি খেয়ে আটকে গেল। রাস্তার ওপর সাইকেল বিপ্লব যেন। বিভিন্ন বয়সী কত মানুষ সাইকেল চালিয়ে পথের বাঁকগুলোতে মিশে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে! এই হারিয়ে যাওয়া দুই চাকার হালকা তালে খুব ছন্দোবদ্ধ লাগছিল। তারা খুব নির্বিকারভাবে অফিসের ব্যাগ, স্কুল ব্যাগ ইত্যাদি জিনিসপত্র সাথে নিয়ে দুলকি চালে প্যাডেল মারছিল। এই দক্ষতার কারণে চালানো বেশ রিদমিক লেগেছে।
 
                                       সাইকেল আর সাইকেল
 
আবার ঝাঁক বেঁধে সাইকেল স্ট্যান্ডে বা ফুটপাথে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য সাইকেল। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে এই দেশে মানুষের চাইতে সাইকেলের সংখ্যা বেশী। আশেপাশের কড়া ট্রাফিক আইন কানুনের দেশগুলোর মত এদেশকে লাগেনি। বরং মনে হয়েছে নিয়মগুলো ট্রাফিক লাইটগুলোর মতই একবার জ্বলছে একবার নিভছে। মানুষের ইচ্ছে হলে মেনে নিচ্ছে, ইচ্ছে না হলে নিজের ধ্যান ধারণা খাটিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কোন পথে চলবে, কোন কথা বলবে।
 
ঝট করে আবার পানিতেই চোখ পড়ল। আমস্টারডামকে কী নাম দেয়া উচিৎ? দ্য সিটি অব হারবার, নাকি সাইকেলের শহর, না খালবিলের শহর? গ্রামাঞ্চলের প্রত্যেকটা অবস্থাসম্পন্ন বাসাবাড়ির সামনে নিজস্ব পুকুর/ ঘাটলার মত এদের আছে খাল। বন্যার প্রকোপ ঠেকাতে আমস্টেল নদীতে বাঁধ দিয়ে স্থানীয় জনগণ আমস্টারডাম শহর বানিয়ে ফেলেছিল। আর আমস্টেল নদীর শাখা প্রশাখা থেকে খালগুলোর শুরু। মোট একশ কিলোমিটারের মত ১৬৫টা ছোট বড় খালগুলো বানানো হয়েছে সপ্তদশ শতাব্দীতে। খালগুলোর ওপর হাজারের বেশী ছোট ছোট সেতু থাকায় মনে হয় আমরা সমন্বিত দ্বীপের শহরে এসেছি। এখানে ওরা খালকে বলে গ্রাখট। গ্রাখটের প্লুরাল গ্রাখটেন। গ্রাখটেনের ওপর প্রাচীন কতগুলোর ব্রিজের ওপর রঙ বেরঙের রোম্যান্টিক তালা পাওয়া যাবে। এই রঙিন তালা সাধারণত নিজেদের ভাব ভালবাসার নিদর্শন হিসেবে ঝোলানো হয়। কখনো কখনো ভাব ভালবাসা পাকেচক্রে মিলিয়ে গেলেও তালাগুলো চিহ্ন হয়ে বাতাসে দুলে যায়।
 
                                   ব্রিজ উইদ লকস
 

                                           

                                                               (চলবে)   

দ্বিতীয় পর্বঃ https://bit.ly/2L0DiUN

শেষ পর্বঃ https://bit.ly/2N4d0S2

Facebook Comments
পোস্টটি ১৩৮৭ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment