জেলির বয়াম
লিখেছেন Jummy Nahdia, মে 16, 2020 12:08 অপরাহ্ণ

মায়ের আলমারিতে একটা জেলির বয়াম ছিল।

কমলা রঙের জেলি ছিল কি সেখানে? আলমারিতে ঠাই দেবার আগে? আমার অবশ্য মনে হত কৌটা ভরতি রোদ। অল্প অল্প করে পাউরুটির গায়ে মাখিয়ে আমরা ভাই বোনেরা সেই কমলা রোদ খেয়ে ফেলছি। বয়ামের রোদ একসময় ফুরিয়ে যায়। আম্মু হয়ত এবার পচিশ টাকা দিয়ে রুপালী কাগজে মোড়ানো মাখনের টুকরো কিনে আনবে বাড়িতে। আর আমার চোখের সামনে ভীষণ নরম শীত বিকেল গলে যাবে একটু একটু  করে।  

আমার মা একসাথে জেলি আর মাখন কিনতো না কখনো। হাতে গড়া রুটি, ডিম সেদ্ধ, দুধের গ্লাসের হিসেব লেখা একটা খাতার পাতা পড়ে ফেলেছিলাম, যখন আমি পড়তে শিখেছি কেবল। সেখানে লেখা ছিল সপ্তাহের কোন কোন বেলা তার শিশুদের পাতে মাছ দেয়া হবে, মাসের কোন কোন দিন গরুর গোশতের টুকরো। ঐ খাতাতেই রোদ আর শীত বিকেলের সুখ লেখা ছিল। লেখা ছিল পচিশ বছর বয়সী এক তরুণী মায়ের সাধ এবং সাধ্যের গল্প, একটু বড় হয়ে বুঝেছিলাম।

আলমারির জেলির বয়াম দিয়ে এই লেখাটা শুরু হয়েছিল। ওপরের তাকে তুলে রাখা ছিল একটা গোলাপি কাতান। নিজের বিয়ের শাড়ির চাইতে মায়ের বিয়ের ঐ গোলাপি কাতানটা আমি গায়ে জড়িয়েছি বেশীবার। শৈশবে একা একা, কপাল আর কপোল ভরতি ক্রিমের ফোঁটা নেলপলিশে বউ সেজে ভূত হতে ভাল লাগত যে বয়সটাতে। মাকে অবশ্য কখনো দেখিনি ওটা পরতে। আমার মনে হত, মায়ের কী আর কাতান পরার দিন আছে? আমার জন্যই তুলে রাখা হয়ত। এখনই পরে পরে দেখি নিজেকে!

আর স্টিলের ড্রয়ারে ছিল সেই জেলির বয়ামটা। ছোট্ট একটা আলো ফুলের গলার মালা।  আচ্ছা, আলো  নামের কোন ফুল  আছে কি কোথাও? কিন্তু আমার শৈশব আলো ফুল দেখতে পেত, সোনালী রঙের একটা গলার মালা। এক জোড়া বিন্দু পাতার কানের দুল। আরও কিছু তোলা ছিল বয়ামটাতে। বয়ামের রোদ ফুরিয়ে তলার দিকে গিয়ে যতটা জায়গার দখল নিয়েছিল, ততটুকু কাঁচের শরীরে গা এলিয়েছিল সে সব সোনা রঙ- লতানো গুল্ম। আমার মায়ের বিয়ের স্মৃতি তোলা ছিল সেখানে। টের পেতাম স্মৃতিগুলো কমে যাচ্ছে আর এই যে স্মৃতি হাত বদল হয়ে অন্য কারো আঙুলে আর কানে উঠছে তাতে আমার মাকে দুঃখী হতে দেখতাম না। এর চেয়ে বরং এ্যালবামের একটা পুরনো ছবি নষ্ট হলে মা কষ্ট পেত বেশী।

আমার আলো ফুলের মালাটা পেতে ইচ্ছে হত। মেয়ে পুতুলের বিয়ে দিতে হবে। মিষ্টি একটা পুতুল, কোমর পর্যন্ত বিনি সুতোর চুল। নীল সিল্কের ওপর জরির সুক্ষ্ম কাজ (চুমকিও ছিল সেখানে) চার আঙুলে একটা শাড়ির বন্দোবস্ত করা গিয়েছে। দুটো আলো ফুল যদি ছিঁড়ে আনা যেত তাহলে মেয়েটাকে আরও কত টুপটুপে মিষ্টিই না লাগতো!

শান্ত নিঝুম দুপুরবেলায় জেলির বয়ামটা ডাকতো আমাকে আয় আয়! জানতাম চাবি কোথায় থাকে কিন্তু সেই ডাকে সাড়া দিইনি। আমার তো মনেও হত অন্তত আলো ফুলের মালাটা কাঁচের ঘরে শান্তিতে ঘুমোক। আমি নাহয় বারান্দার গ্রিলে উঁকি দেয়া অপরাজিতায় মেয়ে পুতুলের বিয়ে দিলাম!

বেলা গড়ায়। একদিন দুদিন তিনদিন আমি অনাত্মীয় দুরাত্মীয় থেকে জানতে পারলাম আমার মা শৌখিন। আমার মা অল্পে তুষ্ট নন। স্বামীর আয়ে তার হয়না তাই সে ঘর সংসার ফেলে নয়টা- পাঁচটা বাড়ির বাইরে থাকে, চাকরি করে। ততদিনে আমি কৈশোরের দ্বারপ্রান্তে। গল্পের বইয়ের জগতে থাকি। চারদিকের ফিসফাস হইচই বুঝতে পারি কিছু কিছু। অথবা কিছুই বুঝিনা।

আমার মনে আছে, একলা বারান্দায় ঝরঝর কাঁদছিলাম। কতগুলো বছর আগের একটা সতের বছর বয়সী মেয়ের জন্য আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। এইচএসসিও শেষ হয়নি যার। ঐ বয়স  থেকেই রান্নাবাটি, ধোয়া পালা, মেহমান,আত্মীয়, তোমাকে পড়তে হবে পড়তে হবে অন্তত ওইটুকু বলতে পারা কিন্তু কীভাবে হবে সেটা বুঝতে না পারা- দুনিয়াই বা কীভাবে চলে বোঝেনা উদারহস্ত জীবনসঙ্গী- মাঝে মধ্যে বিলিয়ে কপর্দকশূন্য হয়ে পড়া যার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তিনটে সন্তানের একে একে সকাল বেলার গামলা ভরা কাঁথা, কোনদিন সাহায্যকারী ছিল, অর্থাভাবে অনেক সময় তাও ছিলনা। আত্মীয় বাড়ি খুঁজে খুঁজে নিরাপদে সন্তান রেখে ক্লাসে যাবার চিন্তা- তার জন্য তো প্রাইভেট কার কোথাও কখনো অপেক্ষা করে ছিলনা, স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় তক নিজের বৃত্তির টাকায় একটা একটা করে সার্টিফিকেটের অধিকার অর্জন সবকিছুর সাথে ছন্দ মিলিয়েই তার এই কর্মজীবি সত্ত্বাটাকে আমি দেখতাম। এর মানে এই না যে মার সমসাময়িক যে মানুষটি ভিন্ন, একই বা কাছাকাছি সংগ্রামের পর গৃহিণী সত্ত্বাটিকে বেছে নিচ্ছেন তার ব্যপারে কোন উপসংহার বা রায় নিয়ে কোন বক্তব্য থাকার ঔচিত্য আছে আমার। যার জীবন যার ইচ্ছে যেখানে যেমন।

রান্নাঘরের পাতিল কড়াইতে রেখে যাওয়া আলু মুরগির ঝোল, ঢেঁড়স ভাজী ডালের কথা মনে পড়ছিল। মনে পড়ছিল চোখে পক্স নিয়ে মায়ের অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি করার যুদ্ধটা। মনে পড়ছিল চালের অভাবে রান্না করতে না পারাটাকে আলস্য বলে প্রকাশ পাওয়া, পাঁচটা টাকা ব্যাগে না থাকার কারণে ক্রন্দনরত শিশুদের দেড় কিলোমিটার হাঁটিয়ে বাসায় যাবার সেই দুপুরবেলা, পরিচিত কারো রিক্সায় যেতে যেতে কাটা টিপ্পনীর কথা মনে পড়তেও রেগে যাচ্ছিলাম আমি। রাগ দমাতে না পেরে ফুলে ফুলে কাঁদছিলাম। আমার মনে গেঁথে গেল শৌখিন শব্দটা।

কী কী সব গেঁথে গেল ভেতরে যে তারপর থেকে আজতক দোকানে সাজানো নান্দনিক শাড়িগয়না চোখে পড়লে কল্পনায় আমি আমাকে দেখতে পেলাম না। অন্য কোন পরিচিতর জন্য কিনলেও আমি নিজের জন্য পছন্দ করে সেগুলো কিনতে পারিনি কোনদিন। হতে পারে এটা এক রকমের অসুস্থতা। অসুখ করেছে আমার।    

মা ঘরে না থাকলে প্রায়ই আলমারি খুলে জেলির বয়ামটা হাতে নিয়ে আমি শৌখিনতা দেখতাম। চৌকোণা দুটো তাকে বেশীরভাগই উপহার পাওয়া শাড়ি আর বেড়াতে যাবার একটা দুটা জামা দেখতাম। আমার ভেতরে ভীষণ প্রোটেক্টিভ একটা শেকড়ের অস্তিত্বও টের পাচ্ছিলাম, যেটা দিন দিন বড় হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল নিবিড় ডালপালায় স্নিগ্ধ করে তুলব আমার ছোট্ট উঠোন। আজ অথবা কাল। যতদিন বেঁচে আছি ছায়ায় আগলে রাখব আদরে। আমি হয়ত থাকবোনা, কাছে কিবা দূরে কিন্তু কেন যেন প্রগাঢ় বিশ্বাস, ছায়াটা মিলিয়ে কীভাবে যাবে? বড্ড গভীরে যতনে রেখেছিলাম সে শেকড়।  

Facebook Comments
পোস্টটি ৬৬১ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
১ টি মন্তব্য
একটি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. নৈঃশব্দ্যের বিমুগ্ধতার মাঝে বেদনা গাঁথা হয়ে গেলো।

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment