নারী ভাবনা ১১
লিখেছেন নীলজোসনা, অক্টোবর 20, 2019 10:49 পূর্বাহ্ণ
গল্পটা বহু আগের পড়া। পুরাটা মনেও নাই। দেখি, কদ্দুর পারি।
 
এক দেশে এক রাজা ছিলো। তার ছিলো রাণী। কিন্তু তাদের কোন ছেলেপুলে ছিলো না। তো, বহুদিনের করজোড় প্রার্থনার পর তাঁদের তিনটা ছেলে হল। রাজপুত্রের মুখ দেখতে গিয়ে রাজা দেখেন, দুইজন মরা আর একজনের জান নাই। মরা রাজপুত্রের কাজ কি, জান নাই যার তাকেই কোলে তুলে নিলেন। দিন যায়, মাস যায়, বছর গড়ায়। রাজপুত্র সর্বগুণে গুণান্বিত হয়ে বড় হয়। একদিন আসে যুদ্ধের ডাক। চতুর্দিকে সাজ সাজ রব, রাজপুত্রের প্রথম যুদ্ধযাত্রা। কোটাল তিনখানা তরোয়াল আনেন। সে কী, দুইখানা তরোয়ালের ফলা নাই, তিন নম্বরটা ভাঙা। রাজপুত্র বলে কথা, তিনি ভাঙা তরোয়ালেই যুদ্ধযাত্রা করলেন। বিপুল রাজ্য জয় করে মাতৃক্রোড়ে ফিরে বললেন, এইবার মৎস্য শিকারে যাবো। আনা হল জাল, দুইখানা ফুটো, একখানা ছেঁড়া। তো, ছেঁড়া জাল নিয়ে তিনি মৎস্যশিকারে গেলেন। মাছ ধরা হল দুইটা, সে ই যে দুইখানা মরা আর একখানার জান নাই। মাছ রাখবেন কিসে? তিনটা পাতিল খুঁজে এনে দেখা গেল, দুইটা ভাঙা আর একটার তলা নাই। তো, তলাবিহীন পাতিলে জান নাই মাছ নিয়ে বীরবেশে রাজবাড়িতে ফিরলেন রাজপুত্র, যার নিজেরই কি না জান নাই।
 
একটু লিখবো বলে পড়ছিলাম, বাংলাদেশের নারীর দৈনন্দিন জীবন নিয়ে। পদে পদে মনে আসে, মীনার দাদীর কথাটা ‘এমনই তো হইয়া থাকে’। আমাদের দেশের নারীর কাজের সংজ্ঞা দেয় নিজ বাড়ির বা শশুরবাড়ির দুই তিন প্রজন্ম আগের মহিলারা। মেয়েবাচ্চা মানেই যেখানে আত্নীয় স্বজনের কালো মুখ, সেই যেন মরা বাচ্চা হয়েছে। সেখানে ‘জান নাই’ রাজপুত্রের মত গ্লানিময় জীবন হয় একটা নারীর। একটা মেয়ে শৈশবে তার পিতার জন্মদাত্রী, মেয়ের মায়ায় বাবা হয়ে ওঠেন পুরুষ। কিন্তু সে আনন্দ রাখার জন্য পাতিল জোটে না, জোটে দুইখান ভাঙা আর একখান তলাবিহীন পাতিল। পিতার দুশ্চিন্তায় সমাজ বদলায় না, মেয়ের স্কুল বন্ধ হয়। এর পর দুইখানা ফুটো, একখানা ছেঁড়া থেকে বেছে ‘বিদেশ থাকে’ এই যোগ্যতায় মেয়েটার বিয়েও হয়।
 
আর যদি কখনও কোন মেয়ে বাতাসের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকে, তার হয় ম্যালা দোষ। না না, আমি বাইরের কথা বলছি না। মেয়েদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ যে জায়গা, ‘ঘর’? সে ঘরের কথা বলছি। ঘরে থাকা কোন মেয়ে যখন একটু মুল্যায়ন চায়, একটু বিশ্রাম, ভালো চিকিৎসা, অথবা পড়াশুনা করেও চাকুরি না করে শখের কাজ করতে চায়, তখন রায় হয়, ‘এহহে সংসারে মন নাই’। আজকের বাংলাদেশের ৬২ ভাগ নারী ঘরেই অনিরাপদ। শৈশব থেকে, বার্ধক্য পর্যন্ত। কারণ, এসব কাউকে বলতে নেই, চুপ; কিংবা মানিয়ে নেয়াই উচিত, কিংবা নারীর কোন সঞ্চয় নাই বলে ছেলে যা দেয় তাই লাভ। এর ফলাফল এক একজন নারীও একটু ক্ষমতা পেলে জঘন্য অত্যাচারী হয়ে ওঠেন। সূর্যের মত, নিজের আলো নাই, চাঁদে চাঁদে লড়াই, আলো দখলের প্রতিযোগিতা।
 
তুমি যেখানেই থাকো, নিজের আলো টের পাও নারী? তোমার গৃহস্থালী, সেলাই ফোঁড়াই, রান্না, কিংবা আবালবৃদ্ধবণিতাকে দেখে রাখার কাজগুলোর অর্থমূল্য থাকতে না পারে, সেসবকে মূল্যহীন ভেবো না। যেন কোনোদিন বলো না, ‘আমি তো কিছু করি না’। অস্থির সময়ের ফুটো পাতিলে তোমার কাজকে মাপার যোগ্যতাই নেই সমাজের। পারলে পাই পাই করে বুঝে নিও তোমার পাওনা সম্মান। সম্মান দিও তোমার চারপাশের আরও নারীদের।
 
ছবিঃ আব্দুর রহমান 
Facebook Comments
পোস্টটি ৭৭৩ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment