নারী, একজন আমৃত্যূ পেশাজীবি (নারী ভাবনা ৯)
লিখেছেন নীলজোসনা, ডিসেম্বর 7, 2018 12:24 অপরাহ্ণ
এক লোককে পুলিশে ধরে নিয়েছে। কড়া আদেশ, ‘এই তুই বসবিও না, দাঁড়াবিও না। শুবিও না, হেলানও দেয়া যাবে না। চুপও থাকবি না, কথাও বলবি না’। বেচারা ভয়ে ভয়ে বলে, ‘দারোগা সাহেব, আমি করবটা কি?’ দারোগার হুংকার, ‘তুই কি-ও করবি না’।
 
খুব অবাক লাগে।
 
মেয়েমানুষ বাসে উঠলে আপত্তি, কি দরকার এইসব চাক্রীবাক্রী করার?
 
মেয়েমানুষ নিজে স্কুটি বা সাইকেল চালায় গেলে, পকেট থেকে চশমা বের করে দেখে আর বলে, ‘ছ্যাহ, কি অবস্থা, সবই ত দেখা যায়!’ আর সে স্কুটিতে এক্সিডেন্ট হলে বা নিজে ধাক্কা খেলে, ‘মেয়েমানুষ ক্যান এগুলা চালায়? পারে না টারে না, মরবেও, মারবেও।’ (এইসব মানুষ পুরুষ বাইকারের গুঁতা খেয়ে কোমর বা পশ্চাদ্দেশ হাতাতে হাতাতে ব্যথা ভুলতে চেষ্টা করে, নিজের চোখে দেখি প্রতিদিন)
 
মেয়েমানুষ টপ জায়গায় থাকলে, হে হে কিভাবে কি করেছে সবাইই জানে!
 
বাচ্চা রেখে চাকুরি করলে, ‘আহহা রে বাচ্চাগুলোর কিসমতই খারাপ, আরে পালতে না পারলে ফুটাইলো কেন?’
 
বাসায় থেকে বাচ্চার খাওয়া নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করলে, ‘আহহা রে, আমার অমুক আত্নীয় বাচ্চা পালে, বাচ্চা পাতিল ধরে খেয়ে নেয়। এমন লেগে থাকা লাগে খাওয়া নিয়ে। হে হে আর কাজ নাই ত…!’
 
মেয়েমানুষ ঘরে বসে অনলাইনে বিজনেস করলে, ‘এই যে আপুরা আজকে নিয়ে এসেছি তোমাদের জন্য দড়কাড়ি একটা ক্রীম’ বলে ট্রল ভিডিও বের হয়।
 
মেয়েমানুষ বাচ্চাদের আনতে গিয়ে অন্য মায়েদের সাথে গপ্পো করলে, ‘উফফফ, কেম্নে যে পারে মহিলাগুলা এতো সেজে…’ইত্যাদি।
 
রান্না করে ফেসবুকে দিলে, ‘আরিব্বাবা, আর কেউ রান্দে না? আমাদের মা খালারা…’ ইত্যাদি।
 
মেয়েমানুষ আর কিছু না করে, টিভি দেখলে, ‘বাব্বাহ, বাঘের মুখ থেকে খাবার আনতে পারবেন, মেয়েমানুষের কাছ থেকে রিমোট না’। এমনকি এই টিভি আছড়ে ভাঙছে, চোর টিভি নিয়েছে দেখে দৌড়ে তাকে রিমোট এগিয়ে দিয়ে আসছে এইসব ফান ভিডিওর অভাব নাই।
 
কান খুলে শুনেন, জেন্ডার আর বাজেট নিয়ে কয়েকটা পেপার দেখবেন। মেয়েরা এই যে বিনে পয়সায় ঘরের কাজ করে, বাচ্চা আনা নেওয়া করে, বাড়ির কচিবুড়ো কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে অলস পুরুষ মানুষের সামনে কলাটা মূলোটা বাড়িয়ে দিয়ে ফুলবাবু সাজিয়ে তৃপ্তি পায়, এসবের জন্য যদি মূল্য দিতে হত, আপনি ফকির হয়ে যেতেন। আর দেশের জিডিপি প্রায় পাঁচগুণ হত। দিতে হয় না, তাই নিন্দা দিয়ে আপনার ভেতরের কালো চেহারা বাইরে আনেন।
 
আপনার মা, আপনার বোন, আপনার বউ, যা করেন, যা ই করেন, অন্তত মনে শ্রদ্ধা করুন। পারলে একদিন দুইদিন রাজুর মত, মীনা বুবুর কাজগুলো নিয়ে করে দেন। নইলে বুড়ো বয়সে টাক পড়লেও চেঁচাবেন, ‘এই তোমাদের জ্বালায়ই মাথায় টাক পড়েছে’।
 
বউ খোঁজার বেলায়, ‘না আপা, ন্যশনাল ইউনিভার্সিটির মেয়ে হলে চলবে না’, আর বউ হয়ে আসলে ওই ‘কি’টাও করতে পারবে না, এই মানসিকতা নিয়ে আছেন তো? বড়জোর বাবুরাম সাপুড়ের ফণাহীন সাপ পোষার আনন্দ পাবেন, বউ কোনদিন বন্ধু হবে না, মা কোনদিন মহিয়সী হবেন না। আর আপনার ছেলেমেয়ে, এই নিরব সাক্ষীদেরও মনে রাখবেন।
Facebook Comments
পোস্টটি ৬৮২ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment