যাক বান ডেকে যাক বাইরে এবং ঘরে
লিখেছেন নীলজোসনা, এপ্রিল 3, 2020 3:42 পূর্বাহ্ণ

শেষ অফিস গেছি ১৬ মার্চ। মাত্র আঠারো দিন আগে। আশ্চর্য! এ আঠারো দিন আলমারির একটা তাকে হাত পড়ছে না, ইস্তিরির কাপড় গোছানো ব্যাগটা একটু আড়ালে রেখে দিতে হচ্ছে না। যেন আমিও ভুলে না যাই, আবার যে ভদ্রলোক তিনটা ব্যাগ নিয়ে একবারে বের হন, তাঁর যেন বাড়তি বোঝাটা নেয়া না লাগে। তবু কোন ফাঁকে নিয়ে হাওয়া হয়ে যাওয়াটাও হচ্ছে না।

মাত্র আঠারো দিন! মেয়ে হওয়ার চার দিন আগে পর্যন্ত ঘর থেকে বের হয়েছি। তখন অনার্স শেষ মাত্র। হল অফিস, লাইব্রেরী, রেজিস্ট্রার অফিস ঘুরে ঘুরে সই নিচ্ছি, ক্লিয়ারেন্সের। দল বেঁধে সবাই মিলে করছি, করা হয়ে যাচ্ছে। পরে একা কিভাবে করবো, এই ভয়ে। যদিও এসব ব্যবহার করে সার্টিফিকেট উঠালাম তারও সাড়ে সাত বছর পরে। আর মেয়ে হবার বারো দিনের মাথায় মাস্টার্সের ভর্তি পরীক্ষা, বের তো হতেই হয়। একই কান্ড ছেলের সময়েও। হাবিজাবি যত কোর্স করি, কেক ডেকোরেশন, কন্টিনেন্টাল কেক, বেসিক বেকিং শিখতে যাই। সাথে দুই বাচ্চাই, একজন ঘাপটি মেরে ঘুমায়, মেয়ে পেটের বাইরে মাথা লাগিয়ে ভাইয়ের সাথে গল্প করে। সুতরাং, এত লম্বা সময় ভালো মেয়ে হয়ে বাসায় থাকা হয় নাই বহুদিন।

মাত্র আঠারো দিন। সময়টা আরও বাড়লে আরও বুঝবো হয়ত। এ কয়দিন শিখেছি যা, লিখে রাখি আপাতত।

এক, জীবন ছোট্ট এর জন্য প্ল্যানিং করতে হয় না – এই কথাটা শুনলে, স্বীকার করি, বিরক্ত হয়েছি সবসময়। আগে না ভেবে রাখলে কাজ করা যায়? সকালে বের হবার প্ল্যান থাকলে আগের রাতে মোজাটা সহ গুছিয়ে রাখার অভ্যাস, সেই কলেজের সময় থেকে। আর মস্ত বড় জীবন নিয়ে প্ল্যান করবো না? ধুত! সেই আমিই এখন জানি, হ্যাঁ পরিকল্পনা করাই যায়। কিন্তু তাতে সবার ওপরে আঁকা থাকতে হয় একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন, ‘তদ্দিন বাঁচলে… বাঁচবো তো?’ না, এতে কাজের ক্ষতি হয় না। কিন্তু ঝরঝরে একটা ভাব আসে। যেন, কি আছে, কি নাই, কি হবে, কি হবে না, কি হতে পারতো আহা, হয় নি কেন, ইস যদি আরেকটু দৌড়াতাম, এই সব একদম ধুয়েমুছে ঝরঝরে হয়ে যাওয়া যায়। চুক্তিতে রিকশা কিংবা সিএনজি চালায় যারা, কিংবা পানওয়ালা বা আমড়াওয়ালা, আগামীকালকের জন্য একটু পুঁজি রেখে বাকিটায় এক দিনের রসদ কিনে বাড়ি আসে, তেমন দিনমজুরের মত দিনটা হাতের মুঠোয় নিয়ে পার করে দেয়া যাচ্ছে। মজার ব্যপার, দিনের শেষে কোন আফসোস নেই, আক্ষেপ নেই, আশাও নেই। রাগ ক্ষোভ হলে ঝেড়ে দিয়ে আবার মাফ চেয়ে ফেলা যাচ্ছে। কারণ, কালকের সূর্যটায় আমার জন্য আলো বরাদ্দ আছে কি না আমি জানি না। আমার বারান্দা থেকে রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মের মোজাইক বাঁধানো বেঞ্চি দেখা যায়, এখন মনে হয় আমি সেইই বেঞ্চিতে বসা কোন নিঃশঙ্ক যাত্রী। ‘তুমি পাঠাইয়াছো তাই এসেছি, ডাক দিলেই চইলা যাই’। 

দুই, স্কুলের একটা, ইউনিভার্সিটির একটা আর কাজের জায়গার একটা, প্রাণের গ্রুপ। সব মেয়েদের নিয়ে। বিয়ে, বাচ্চা হওয়া, বাচ্চা হবার খবর দেয়া, নইলে ডিগ্রী শেষ করা, এই ছাড়া কথা হয় এতো কম। এমনকি রোজ দেখা হওয়া মানুষগুলোর সাথেও, টুকটাক কথা কেবল। এ সুযোগে সবাইকে বাসার জামায় দেখা হচ্ছে, গ্রুপ ভিডিও কলে একেক জনের বাচ্চা এসে হুমড়ি খেয়ে ক্যমেরা ঢেকে দিচ্ছে। কতদিন ওদের মায়েদের খবর নিই নাই, অথচ আন্টিরা স্কুলের বা কলেজের গেট আলো করে দাঁড়িয়ে থাকতেন রোজকার অভ্যাসের মত। ফোন রেখে বাতি নিভে আসা স্ক্রীণে তাকিয়ে ভাবি, আমরা তো আসলে কাছেই ছিলাম এতোদিনও। শুধু সেটা ভুলে গেছিলাম!

তিন, কত কম জীবনোপকরণ হলে মানুষ বাঁচে? কতকিছু লাগতো রোজ, আসতে যেতে কিনতাম, আনাতাম। আজকাল যেন কিছু আর লাগে না। না, আমি স্টক করি নি কিছু। নিয়মিত রুটিনেই চলছে, তবু যেন যা আছে তা ই অনেক। বাড়তি কিছু করতে গেলে প্রতিবেশী টনটনে আত্মসম্মানওয়ালা বাচ্চা মেয়েটার কথা মনে আসে। একদিন এক রাত ছিলো এসে, খেতে বসার আগে মায়ের কাছে ফোন করতে চাইতো। অথচ তার ঘরে কেবল হয়ত ডাল রান্না হয়েছে।

চার, জেন্ডার বিষয়ক রসিকতা ভেসে বেড়াচ্ছে সবখানে। দশ বছর হবে কিছুদিন পর, পার্টটাইম ফুলটাইম সব ধরণের চাকরি মিলে। তবু বলতে পারি, মেয়েদের মন আর পা, অফিস ফেরত উড়ু উড়ু হয়ে বাসার সিংক, বাচ্চাদের হোমওয়ার্ক কিংবা ‘কালকের জন্য একটু পেঁয়াজ কেটে যেয়ো’তে লটকে থাকে। আর যাদের থাকে না? সেই ঘরবাসী প্রবাসীরা এখন বাসায়। তো বাঙালী নারী এবার খু…্তি বাসন ধার করে ‘মিনসে’কে দিয়ে ঘরের কাজ করানোর হুজুগে নারী অধিকার আদায়ে ব্যস্ত। মজার মজার ভিডিও হচ্ছে, স্টিকার আসছে। ভাবছেন কি? চাপে পড়ে, কিংবা মায়ায়, অথবা মনের আনন্দেই এইসব করে ফেললেই বেশ অধিকার আদায় হয়ে যাচ্ছে? কোন পুরুষ কিন্তু মনে মনে ঠিকই ভাবছেন, তা থেকে লিখেও ফেলছেন ‘এইসব মেয়ে মানুষের কাজ যে আর কতদিন…’। না লিখেও কেউ ভাবছেন, আহারে মেয়েদের কত কষ্ট অথচ লকডাউন ফুরালেই আবার যে কে সে-ই হবে। এবং এসব বুঝতে জ্যোতিষী হতে হয় না। আমি ভাবছিলাম অন্য কথা। আমার কাছে, কাজের দক্ষতা হিসেবে কাজের জায়গার পৃথকীকরণ অন্যায় মনে হয় না, যতক্ষণ না এক পক্ষ আরেক পক্ষকে হেয় করেন। এ হিসেবে, ‘কি কর সারাদিন বাসায়?’ আর ‘অপিসে তো কেবল গিয়ে বসেই থাকে, পায়ের ওপর পা’ এ দুইই অন্যায়। বাসায় থেকেও একটা মানুষ চেয়ারে পা বদল করে বসার অবসর পাচ্ছেন না, তিনি অফিসে যা করেন সেটুকু আমি শ্রদ্ধা না করলে কে করবে? আর আমিই বা তাঁকে শ্রদ্ধা না করে নিজের কাজটাকে ভালোবাসবো কিভাবে? কিভাবে বাচ্চারা শিখবে, যে কাজের জায়গা যাই হোক না কেন, পরিশ্রম এবং কেবল পরিশ্রমই শ্রদ্ধার্হ? (এইটুকু পড়ে সেই একজন আমাকে মেসেজ দেবেন। কে বলে তোমাকে নারীবাদী, তুমি আস্ত পুরুষবাদী, সব ওদের হয়ে বলো!!)

যদি আরও কয়েকদিন, কয়েকটা আঠারো দিন রিজিকে অক্সিজেন, মনে শান্তি, ওয়াইফাই আর কারেন্ট (ইস কতকিছুই না লাগে মানুষের!) থাকে, আরও লেখা হবে হয়ত। সেখানে ‘পাঁচ’ নং থেকে শুরু হবে। ইনশাআল্লাহ।

Facebook Comments
পোস্টটি ৫৪৮ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment