মেহেরপুরের ডাইরিঃ ৬
লিখেছেন নীলজোসনা, জুন 8, 2018 8:39 অপরাহ্ণ

৪ মে, রাত ১০:০০

ফিরতি বাস

হাইওয়ের একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে। অদ্ভুত সে সুন্দর টের পাচ্ছি, কারণ বসেছি সবচেয়ে পেছনের সারিতে। ভাগ্য ভালো তাই এটাই পাওয়া গেছে, এরপর আর বাসই নাই। সিটটা উঁচু, সমস্তটা বাসকে একটা আলোর মিছিল মনে হচ্ছে পেছন থেকে। এমনিতেই মোশন সিকনেস আছে, তার ওপর শেষের সারির সিট। ফোন, বই সব ভুলে রাস্তার সৌন্দর্য দেখছি।

আজকের দিনটা ভীষণ সুন্দর ছিলো। সকাল সকাল উঠেই মেহেরপুর মুজিবনগর গেলাম। প্রথম বিস্ময়, আম। এত আমগাছ আর তাতে এত আম, অবিশ্বাস্য লাগে, চোখ ধরে আসে। আর আফসোস হয়, কেউ একটু দোকান দিয়ে বসেনি, একটু কেটেকুটে ঝাল মাখিয়ে দিবে। আম্রকানন নামের মাহাত্ম্য এখানে।

দ্বিতীয় বিস্ময়, বৈদ্যনাথতলা। ১৯৭১ এর সতরই এপ্রিলের শপথের জায়গাটা এত সুন্দর করে সাজানো আছে, বলার অপেক্ষা রাখে না। শুরুতে দেখলাম একটা স্মৃতিসৌধ, জাতীয় স্মৃতিসৌধের মত প্রায়। মেঝেটা পাথর দিয়ে খোদাই করা। চারপাশে ছোট ছোট স্থায়ী প্ল্যাকার্ড, ১৯৭১ এ বিভিন্ন পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধের কভারেজ প্রদর্শিত হচ্ছে।

কিন্তু বাংলাদেশের ত্রিমাত্রিক মানচিত্রের কাছে গিয়ে সব বিস্ময় হার মানবে। মস্ত বড় মানচিত্র, তাতে শরণার্থী, মুক্তিযুদ্ধ, গেরিলা অভিযান সব কিছুর স্থির সাক্ষী বানিয়ে রাখা হয়েছে। নিচে থেকে একেবারে বোঝা যায় না। উঠতে হবে প্রায় পাঁচতলা উচ্চতায়। মানচিত্রের চারপাশে ঘোরানো করিডোর আর সিঁড়ি। উঠতে গিয়ে অবাক হলাম। রাজারবাগ পুলিশ লাইন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল এগুলোয় সশস্ত্র বাহিনীর তান্ডবের প্রতিকৃতি বানানো। হাঁপাতে হাঁপাতে উপরে উঠে মনে হল, কষ্টটা সার্থক হয়েছে। চমৎকার ফিরোজা রঙের দেশটা, তাতে সাদা সাদা ঘটনা খোদাই করে বসানো, যেন নিজেই গল্প বলে চলেছে। নেমে এসে মনে হচ্ছিলো, এই জায়গাটা খুব গর্বের হতে পারতো, হতে পারতো জাতির জন্য নিরংকুশ অহংকারের। যদি না এত বছর পর আজও অন্যায় অবিচার বৈষম্যের প্রলম্বিত দুঃস্বপ্ন জাতির ঘাড়ে চেপে না থাকতো।

ফিরে হাপুশ হুপুশ খেয়ে রওনা দিলাম গাংনীর উদ্দেশ্যে। এ বাড়ি থেকে সেই ভাবী, তাঁর মেয়েটা, আপা, সব মিলে বেশ জমজমাট অটো। ডাক্তার ভাই পেছন পেছন আসছেন বাইকে করে, ভাবীও। হুঁশ করে পাশ কাটাতেই হুংকার দিচ্ছেন। বাচ্চারা জবাব দিচ্ছে আরও জোরে।

আব্বু ফোন করেছেন, কই এখন? বললাম, ভূতপূর্ব কলিগের বাসার ছাদে বেল পাড়ি! গাছভরা পেঁপে; খালাম্মা দৌড়ে এনে কেটে দিচ্ছেন। চুলায় চা ফুটছে, টেবিলভর্তি স্নেহের অত্যাচার। সব ছাপিয়ে খালাম্মাকেই দেখছিলাম। চেনা নাই, জানা নাই; ছেলে ফোন করে বলেছে, তাতেই আপ্যায়নের চুড়ান্ত করে যাচ্ছেন। যত কথাই বলছেন, হাঁ করে শুধু তাঁকেই দেখি, এত সুন্দর মানুষ অথচ এত নিরহংকার, দুর্লভ যোগাযোগ। তাঁর বইপড়ুয়া ছেলের ঘর দেখালেন, ডাইনিং রুমের একপাশে সিঁড়ি, বেয়ে ছাদে উঠে খুটা ধরিয়ে দিলেন, বেল পাড়লাম আমি আর ভাবি। আর গল্প শুনলাম, ভাই থাকতে কিভাবে আড্ডা হত ছাদে। বিকেলে ফেরার সময় মনে হচ্ছিলো, কি যেন ফেলে যাচ্ছি, ফাঁকা ফাঁকা অনুভূতি।

রঙ, আমার নিজের সাথেই থাকতে বেশ লাগে। বেড়ানোর খুব নেশা নেই। কিন্তু মাঝেমধ্যে এরকম জোর করে কোকুন ভেঙে বেরোনো উচিত, জানো? এই যে ভৈরব নদীর শনশন বাতাস, এই যে গোলমতো ধানের গোলা আগে দেখিনি কখনও, তাই অটো থামিয়ে ছবি তুলেছি, এই যে অটোচালানো মাসুম ভাইয়ের ট্যুর গাইডিং, গাংনীর একটা চমৎকার শান্তিনিকেতন বাড়িতে আঁচলপাতা মায়া, কোথায় পেতাম বলো?

আমার মানুষ দেখতে এত ভালো লাগে। নাম জানা নেই, সুর চেনা নেই, এমন রঙেরা মাখিয়ে থাকে প্রতিটা মানুষের সাথে, তাদের আবিষ্কার করতে ভালো লাগে। মেহেরপুর নামটা এক অভূতপূর্ব রঙের পশলা হয়ে, মাণিক্যভরা গয়নার বাকসো হয়ে জমে থাকবে স্মৃতির আলমারিতে। তার একটু ছোঁয়া সবার জন্য লিখে গেলাম।

Facebook Comments
পোস্টটি ৫৬৭ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment