মেহেরপুরের ডাইরিঃ ৫
লিখেছেন নীলজোসনা, জুন 4, 2018 8:56 পূর্বাহ্ণ

৩ মে, রাত ১১:২৫,

ফিন টাওয়ার, মেহেরপুর।

তখন স্কুলে পড়াই, ২০১৪ সাল। রাত প্রায় এগারো। কলিগ এক ছোট ভাই ফোন করলেন হঠাৎ। কি ব্যপার? “আপা বাড়ি যাই, আমার কাজিনকে তুলে নিয়ে গেছে, পুলিশ”। যেতে হচ্ছে কেন? “আপা, মেরে ফেলবে”। ধ্যৎ, তাই হয় নাকি? আচ্ছা দেখে আসুক।

এরপরের রাতটা বিভীষিকাময়। প্রতিটা দম আটকে দেখছি, কিছুক্ষণ পরপর ভাইটা ফেসবুকে লিখছেন, “এই এখন থানায় নেয়া হয়েছে আমার ভাইকে”, “এইমাত্র বের করা হল”, “ওসিকে ফোন করেছি, গুলির আওয়াজ”, “আমার ভাই নাই, ইন্নালিল্লাহি… “। আমার সাহস হয় নাই উনাকে ফোন করার। শুধু সারাটা দিন নিজের ভেতরে এক অজানা প্রস্রবণ, উত্তপ্ত, ক্ষোভে দাউদাউ জ্বলছে কি যেন। বাচ্চাটা আমার মেয়ের সমান মৃত ভাইটার, স্ত্রীও মনে হয় আমার সমানই হবেন। কি সাধ্য আমার, আমি পাশে দাঁড়াই?

কলিগ ঢাকা ফিরলেন দুই সপ্তাহ পর, মুখে বোবা শোক। ভয়ে ভয়ে ভাবীটার নাম্বার নিয়ে ফোন করলাম একদিন। কেন? জানিনা। সেই থেকে টুকটাক কথা হয়। শুরুতে শুধু কান্না শুনতাম। আর এপাশে টের পেতাম, ওপাশের ফুঁপিয়ে কান্নার জবাবে এপাশেও কান্নাক্ষরণ হচ্ছে। প্রতিবার ফোন রাখতে ভাবী বলতেন, “আপা একবার আসেন”। আমিও, একদম কোন আশা ছাড়াই, অভ্যাসের বশেই বলতাম, ইনশাআল্লাহ। এবার কিভাবে কিভাবে যেন চারপাঁচদিন টানা ছুটি। কিভাবে যেন সিদ্ধান্ত নেয়া হল, ওখানেই যাই। এর মধ্যে সেই ছোট ভাই ঢাকা থেকে ফোন করে করে বাকি সব কাজিনদের ব্যতিব্যস্ত করে ফেলেছেন। তাঁরই ডাক্তার ভাইটাকে সান্তনা দিতে বলেছি রাতে আসবো, আর পরদিন ওখানেই থাকবো।

বিকেলে আমঝুপি নীলকুঠি দেখতে গেছি। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথের যুদ্ধে যে নীলকুঠি থেকে ইংরেজ পক্ষের যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। পলাশীর প্রান্তর আর মাত্র সত্তর কিলোমিটার দূরে, কিন্তু দেশের সীমানার বাইরে। এ কুঠিতেই সেই নতজানু বেঈমান মীর জাফর আসতো, মিটিং করতো। এসবেস্টসের ছাউনির ওপর টালি দেয়া ছাদ, প্রকান্ড হলঘর, মহিশের মাথা ঝোলানো। বাঈজী এসে নাচতো যেখানে, সে ঘরের মেঝেতে কাঠ লাগানো। যেন ঘুঙুরের শব্দ ভালো করে বাজে। গঠনের নৈপুণ্য আছে দালানটায়, নইলে অত বছর টিকে কি করে, কিন্তু কিসের যেন অভিশাপ মাখা গন্ধ, অশ্লীল অপবিত্র নিঃশ্বাসের বাতাস, বের হয়ে দম ছেড়ে বাঁচলাম।

সেখান থেকে ভাবীর বাবার বাড়িতে গেলাম। প্রথম দেখা। সাড়ে চার বছরের পরিচয়ের পর। আনুষ্ঠানিকতা ভুলে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠেছি দুজনেই। অসম্ভব মিশুক, চঞ্চল এই মানুষটা নিজের ভালোবাসার মানুষ হারিয়ে কিভাবে একা থাকেন, কল্পনা করতে পারি না। ছোট তাশফি নাকি অনেক বড় এখন, কথার খই ফোটে মুখে, কিন্তু দেখা হল না। আমরা যাবো বলে চাচারা এসে নিয়ে গেছেন বিকেলে। কত এলোমেলো কথায় সময় যায়, বাইরের ঘর থেকে তাড়া আসলো। মনের মধ্যে হাজারো আবেগ চেপে বের হলাম। গন্তব্য ডাক্তারের বাড়ি। বাকি ভাবীদের সাথে দেখা হয়ে মন ভরে গেছে। কি সুন্দর একটা পরিবার। আগেও ছিলো, সে স্বভাবের জৌলুশ এখনো আছে, নেই শুধু সবচে বড় ভাইটাই। আসলেই ছোট্ট তাশফি এখন অনেক কথা বলে। বাবার সাথে চেহারার অনেক মিল। তাকাতেই শিউরে উঠি শুধু, ও কি জানে ওর কি হারিয়ে গেছে?

মফস্বলের রাত, তার ওপর অটোচালক ভাইজানের তাড়া, অটো নাকি রিমান্ডে দিতে হবে। মানে কি? চার্জ দেবে। রিমান্ড কেন? রিমান্ডে ইলেক্ট্রিক শক দেয় না? খোদা, এদেশের মানুষের রসিকতাবোধও মারাত্মক দিয়েছেন।

বাচ্চারা ঘুম, ওদের বাবাও। জানালায় শহর দেখি, আমার প্রিয় কাজ, চোখে গেঁথে নিই শহরের রঙ, আর ব্যাগ গোছাই। শুধু একটু চা নাই, আর সব তৈরী। স্মৃতিতে গেঁথে যাচ্ছে এক একটা সেকেন্ড, মিনিট; টিক টিক।

Facebook Comments
পোস্টটি ৬২৬ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment