সহমর্মিতা বা এমপ্যাথি, মানবিকতার সার্বজনীন রূপ
লিখেছেন নীলজোসনা, নভেম্বর 9, 2019 2:56 পূর্বাহ্ণ

এমপ্যাথি শব্দটা প্রথম শুনে, বলতে দ্বিধা নেই, একটু একঘেঁয়েমির নজরেই শুনেছি। কারণ, প্রতিদিনই নতুন কিছু জানি বা পড়ি। খুব বেশি সংখ্যক ব্যপার হৃদয় স্পর্শ করে না। কাছাকাছি যে শব্দ জানতাম, সেটা হল সিমপ্যাথি, সমব্যথি হওয়া। সেটা ভালো কাজ নিঃসন্দেহে, খুব কঠিনও না। রাস্তায় কেউ ভিক্ষে করছে, হাতে দু’টা পয়সা দেয়ার পেছনের অনুপ্রেরণাটির নাম সমবেদনা, ‘আহারে, কষ্ট পাচ্ছে’। আর যে মানুষটি হাত পেতেছে, তার অক্ষমতা তাকে কি রকম যন্ত্রণায় ফেলেছে, সেটা বুঝতে চাওয়ার নাম হচ্ছে সহমর্মিতা। পার্থক্য কি? আপনি হয়ত দুটো পয়সা দিতে পারছেন না, কিন্তু বৃষ্টিতে তার বিছানো কাপড়টার কোণা ভিজে যাচ্ছে দেখে গুটিয়ে দিলেন একটু। অর্থের বিচারে এর কোন মূল্য নেই। কিন্তু মানুষটা, যে ভিক্ষে করছে, মনের মধ্যে একটু হয়ত ভাববে। জানেন, সারাদিনের পয়সার হিসেব করার পর সেই অংকটা তার পরদিন আর মনে থাকবে না, কিংবা পরের সপ্তাহে। কিন্তু আপনার সেইটুকু আচরণ হয়ত তার অনেক দিন মনে থাকবে।

ভাবছিলাম, বাচ্চাদের কি করে এমন শেখানো যায়? কারও কষ্ট দেখে কিংবা কেউ কষ্ট দিলে যখন মা’কে এসে জড়িয়ে ধরে বলে হালকা হতে পারবে না, তখন যেন নিজের কষ্টটা নিজেই সামলে নিতে শেখে? দুইটা গল্প বলি তাহলে।

মেয়ে একদিন স্কুল থেকে ফিরে অশ্রুসজল চোখে জড়িয়ে ধরেছে।

আম্মু জানো, … মিস না এত কঠিন করে বকা দেয়।

কেন দিলো বকা?

কি জানি। আমি কিছু করি নাই, এসেম্বলির পর ক্লাসে যাচ্ছিলাম। বলে, এই বাচ্চারা দুষ্টুমি করবে না। এই খাদীযাহ, সোজা হয়ে হাঁটো। আর একদিনও ক্লাসে এসে আমাকে নাম ধরে বকা দিছে।

ওহ রে, তোমার খারাপ লাগছে এখনও?

হুঁ।

আচ্ছা শোন না, জানো মিসকে তো আমি চিনি। আমি উনাকে বলে দিবো। যে, খাদীযাহ কোন ভুল করলে ওকে বলবেন, ও ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু অন্য সবার সামনে বকা দিলে তো ওর খারাপ লাগে। বলবো?

আচ্ছা। আচ্ছা আম্মু মিস কেন এত বকা দেয়? অন্য কেউ তো এমন করে বকা দেয় না!

জানো, মিসের না কোন বাবু নাই। এই যে তোমরা আম্মুর কাছে কত দামী। আমি অন্য কারোর বাচ্চাকে বকা দেয়ার আগে ভাবি, ইস ওদের আব্বু আম্মু কত কষ্ট করে এই বাবুটাকে এত বড় করেছে। এজন্য বকা দেয়ার হলেও অনেক সময়ই দিই না। তোমার মিস এই যে আম্মুর কষ্টটা কিভাবে বুঝবে? তুমি আল্লাহর কাছে দুয়া কর, হ্যাঁ? যেন তোমার মিসের বাবু হয়, তারপর মিস দেইখো আর বকা দিবে না তোমাদেরকেও।

আচ্ছা আমি এখনই মিসের জন্য দুয়া করবো। আহারে, একটা বাবু নাই। কিভাবে থাকে মিস?

বলেই ভোঁ দৌড়। আমি যে একটু বলবো, যে, ‘আগে দুয়া করিস যেন মিসের বিয়েটা হয়’, সুযোগই পেলাম না! পরে অবশ্য খবর নিয়ে জেনেছি, ক্লাসের কিছু ভদ্র(!) বাচ্চা মিলে আগের দিন একটা সমবেত দুষ্টুমি করেছিলো, এটা ছিলো তারই ফল।

আর একদিন ছেলে এসেছে মুখ ভার করে। বোনের ছুটির আগে তার স্কুলে অপেক্ষা করতে হয়, প্রায় এক ঘন্টা। সে সময়টা সে স্বভাবসুলভ দৌড়াদৌড়ি করে। প্লেগ্রাউন্ডের পাশেই বসেন একজন মিস, যিনি জাতিতে আমেরিকান, বয়স প্রায় ৫৫, তিনি ওকে একদিন আচ্ছামত বকে দিয়েছেন, বারবার ওরা অফিস রুমে ঢুকছিলো বলে। যতই বলি, মিসের কাজের ব্যাঘাত ঘটায় তোকে অত জোরে বকে দিয়েছে, সে মানতে রাজি না।

কেন বুঝায় বললো না? কেন আদর করে করে বললো না? তাহলেই তো আমি আর দৌড়াতাম না।

আচ্ছা এই যে তুমি একটা কষ্ট পাচ্ছো, আম্মুকে এসে বলে দিলা। বা কখনও বুবুকে বা বাবাকে বলো। বল তো, তোমার মিসের এমন কষ্ট লাগলে কাকে বলে?

জানিনা তো। কাকে বলে?

মিসের এই দেশে কেউ নাই, জানো? আব্বু আম্মু, কেউ না। উনারা তেরো ভাইবোন, কেউ নাই এখানে। আর মিস কত্ত বড় জানো? তোমার নানুর চেয়েও বড়। বলো, তোমার সকালে ঘুম ভেঙে স্কুলে যেতে কষ্ট হয় না কত? মিস সবার আগে এসে স্কুলে বসেন। কত বয়স, তবুও। না?

হ্যাঁ। জানো আম্মু মিস না আমাকে দুইদিন অরেঞ্জ ক্রিম বিস্কুটও খেতে দিয়েছে!

দেখছো? আসলে মিস অনেক ভালো। শুধু ওই যে, কাউকে নিজের কথা শেয়ার করতে পারে না দেখে হয়ত হঠাত বকা দিয়ে দেয়। নইলে তো বুঝায় বলতো, না?

মাসখানেক পর,স্কুলে গেছি। ওর সেই আমেরিকান মিস ডাকলেন।

নাশপাতি টিফিনে দাও না কেন?

কিভাবে জানেন?

তোমার ছেলে নাশপাতি আনলেই এক টুকরো দিয়ে যায় আমাকে। এ সপ্তাহে দেয় নি, তাই জিজ্ঞেস করলাম।

জবাব দিবো কি, মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানাই আল্লাহকে। যিনি ওর মনে মায়া দিয়েছেন, নিজের দশগুণেরও বেশি বয়সের একটা মানুষের একাকীত্বের আঘাতে মলম দিতে।

আমার সন্তানের জন্য কেবল আর্থিক স্বচ্ছলতা চাই না আমি। ভবিষ্যতের নিরাপত্তায় ভালো পড়াশুনার সুযোগ, কিংবা চাকুরিও ওরা নিজেদের পছন্দে বেছে নিক। শুধু এই যে কারুর না দেখা ক্ষত দেখতে পারার চোখ, সে চোখ যেন জীবন্ত থাকে, আজীবন।

#কচিকাঁচাগুলো_ডাঁটো_করে_তুলি ৭

প্রথম পর্বঃ https://goo.gl/DjQvnp

দ্বিতীয় পর্বঃ https://goo.gl/DvBCNe

তৃতীয় পর্বঃ https://goo.gl/2iRBmC

চতুর্থ পর্বঃ https://goo.gl/YCEdJm

পঞ্চম পর্বঃ https://bit.ly/30NDE8C 

ষষ্ঠ পর্বঃ https://bit.ly/34MtXtl 

 

Facebook Comments
পোস্টটি ৬৮২ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment