কচিকাঁচাগুলো ডাঁটো করে তুলি (৬)
লিখেছেন নীলজোসনা, জুলাই 22, 2019 4:18 অপরাহ্ণ
সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয় খুব ধীরে। একদিন, দুইদিন, এক মাস, দুই মাসে। আমার শৈশবের কথা মনে আছে, ছয় বছর বয়স তখন। আমরা কেবল ঢাকা এসেছি, একতলা বাসা। প্রায়ই জানালা দিয়ে হাত দিয়ে চাদর টান দিয়ে নিয়ে যায় আর চাদরের উপর থাকা সব কিছু। তো, এমন এক চোরকে একদিন প্রায় মধ্যরাতে আম্মু জানালায় দেখে বিকট চিৎকার করে পাড়া জাগিয়েছেন। আশেপাশের কয়েকটা লোক এসে তো লোকটাকে ধরেই মার শুরু করেছে। আম্মু দরজা থেকেই চিল চিৎকার, মারবেন না! পরে ওরা ছেড়ে দিয়েছে, কে যেন আচ্ছামত বকে লোকটাকে বিদায় দিলো। সেই আদ্যিকালেও সাপের মত চোর পেটানোর রেওয়াজ ছিলো।
 
আট নয় বছর বয়স। খুব কাছের এক আত্নীয় গায়ে হাত দিতেন অকারণে। ঘিনঘিনে অনুভূতিটা মনে আছে। এখন উনি অসুস্থ, পঙ্গুপ্রায়। তবু দেখতে গেলে কাছে বসতে ডাকেন। বলা ঠিক নাকি জানিনা, আমার উনাকে ঘেয়ো কুকুরের মত লাগে। মায়া না, করুণা হয়। একটা রুটি কিনে দূর থেকে ছুঁড়ে ফেলার করুণা। সে যুগেও, ঘরে ঘরে না হোক, এইসব লোক ছিলো। আবার উল্টাটাও ছিলো।
 
প্রযুক্তি আসলো। আমরা দেখে দেখে জ্ঞান অর্জন চিনলাম। একটা জায়গায় সত্যিকারে না থেকে সে জায়গা দেখলাম অন্যের চোখে। যে দেখালো, তার লাভ কী? ব্যাস। লাভের হিসাব। ইউটিউবে আগে কেউ শখ করেও একটা ভিডিও দিতোনা। এখন দেয়, কারণ লাভ আসে। অন্য জায়গায়, দুই চারশো লাইকের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেয়া গেলো ক্যামেরার সামনে। হাস্যকর, নোংরা সব পোশাক আর অঙ্গভঙ্গি আস্তে আস্তে জনপ্রিয় হল। যে লাইক বেচে একটু ইন্টারনেটের বিলটাও যোগাড় হয় না। যা ছুঁতে ধরতে পারিনা, তার জন্য আমরা আমাদের প্রাইভেসির বারোটা বাজিয়ে দিলাম।
 
এখন আমাদের কাছে সব বাইনারি। আমরা রোবট বা কম্পিউটার প্রোগ্রাম যেন। সবাই আমাদের কাছে বস্তু। আনন্দও বস্তু কেন্দ্রিক, দুঃখ আসে বস্তুকে না পাওয়ার কষ্টে, রাগ ঘেন্না সব এমন।
 
আমাদের সমাজটা আস্তে আস্তে, আমরা যতদিন টের পাইনি, কিছু ফোঁপরা মানুষে ভরে গেছে। এদের মধ্যে এই সভ্যতার সারবস্তুর কিছুই নেই। এসব মানুষ শুধু অনুকরণ করে, মুহূর্তে বাড়িয়ে তুলতে জানে কোনো কাজের গভীরতা।
 
হ্যাঁ, এর উপকারিতা আছে। ফেসবুকে দেখে কাউকে দান করেছেন, দুস্থদের ত্রাণ দিতে গেছে তরুণেরা, মানি। এর দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা বলেন দেখি? হঠাত  জোশ আসায় ভালো কাজ করেছে, অথচ নিজের মা-বাবার সাথে ভালো ব্যবহার করেনা, এমন তারুণ্য আছে আমাদের। মানুষের জন্য অন্তপ্রাণ, অথচ জেনেবুঝে কষ্ট দিচ্ছে অধীনস্থ কাউকে। এমন বড় মানুষের সংখ্যাই বেশি।
 
আগের দিনে মানুষ দর্শন শিখতে গুরু বাছাই করতো। সে চিন্তার দর্শন হোক, বা কাজের দর্শন। মুজতবা আলীর লেখায় পড়েছিলাম, সিরামিকের হস্তশিল্প বানানোর জন্য শান্তিনিকেতনের এক সহপাঠী এক গুরুর কাছে গিয়ে কি অধ্যাবসায় দেখিয়ে তবে শেখার অনুমতি পেয়েছিলো। সক্রেটিস, কিংবা গ্যালিলিও, আরও পরে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারীরা, বুদ্ধ বা মনুর অনুসারীদের কথা ভাবলেও একই কথা মনে হয়। কী সেটা?
 
জীবন এক আশ্চর্য রসায়ন, এক চলমান গবেষণাগার। গরুর বাচ্চা পেট থেকে পড়েই তিড়িং বিড়িং লাফায়, অথচ মানুষের দীর্ঘ সময় লাগে কেবল আত্ননির্ভরশীল হতে। এই সময়টা দেয়ার যৌক্তিক কারণ আছে। আল্লাহ চান, যেন এই সময়ের ফাঁকে আমাদের মস্তিষ্কও তৈরী হয়ে ওঠে। আজকাল ডাক্তাররাই শিখিয়ে দেন আমাদেরকে, বাচ্চাকে যেন খাবার খেলনা এগুলো অন-ডিমান্ড দিই, এবং অস্বাস্থ্যকর ‘ডিমান্ড’ এর জবাবে চট করে যা তা কিনে না দিয়ে বুঝিয়ে বলি। তার পর লম্বা সময় চার দেয়ালের ভেতরে কাটাতে হয়। বয়সে বড় কারও ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল থাকতে হয়। ওই সুযোগে সামাজীকিকরণ শেখা হয়, অপেক্ষাকৃত বেশী অভিজ্ঞতা সম্পন্ন আরও কিছু মানুষের কাছ থেকে। যেন হাতে বৈঠা নেয়ার আগে শুধু নৌকা চালানোই না, নৌকা কেন চালাবো, কতদূর যাবো, তাও জেনেবুঝে নেয়া যায়।
 
আজকের একটা বিশ বছর বয়েসী তরুণ বা তরুণীর কথা ভাবেন। শৈশবে এদের খাদ্যের চাহিদা তাও বা যদ্দুর পূরণ হয়েছে, মাথার গঠনে সময় নিয়ে বসে কাজ করেছেন কয়জন? বাবা-মা জীবনযুদ্ধের হাল ধরে বসে আছেন, দাদা দাদী নানা নানী অনুপস্থিত, বা অবহেলিত। এর মাথায় কোন দর্শন নেই, ভোগের দর্শন ছাড়া। কাউকে একটা মেসেজ দিয়ে অস্থির হয়ে পড়ে, ‘দেখেছে কিন্তু জবাব দিচ্ছে না’। সকল অনুভূতিই এই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। প্রশ্ন করে দেখেন, তার করা চরম কোন অন্যায় কাজের জবাবে কি বলে? ‘জাস্ট হয়ে গেছে’। শরীর, মন, মানসিকতার এই যে ‘তাৎক্ষণিক’ দর্শন, এর উৎপত্তি আমাদের অবহেলায়, এর বিকাশ অস্থির মিডিয়ায়, এর প্রভাব আমাদের সম্পর্কগুলোয়।
 
আপনি আমি ছি ছি, হায় হায় করতে পারি। কিন্তু এতে কোন লাভ হবে না। চাইলে নিজের সন্তানের সাথে এ ভুলের পুনরাবৃত্তি হওয়া থেকে বাঁচতে পারি আমরা। যেন, আবার পনর বিশ বছর পর ওরা আবার ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে। আর ততদিন তো বাঁচতে হবে।

বিশ্বাস করেন আর না ই করেন, মশা মারার যেমন ওষুধ নিয়ে বের হয় সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা। এমন একটা টীম দরকার। একটা না আসলে। হাজারটা লাগবে। যারা এসময়ের এই অস্থির মানুষগুলোকে এই ‘তাৎক্ষণিক’ জীবনবোধ থেকে বের করে আনতে পারে।

পাখি জামা দেয় নাই দেখে গলায় দড়ি দিয়েছে, সিরিয়াল দেখতে দেয় নাই দেখে জামাইকে মেরেছে, যৌতুকের জন্য বউকে মেরে কেটে ব্যাগে ভরে ফেলে দিয়েছে, আপাত দৃষ্টিতে এই সব মানুষ কিন্তু দেখবেন নিরীহ। অথচ ভেতরে জঘন্য অমানুষ হয়ে আছে। যারা আর কোথাও পারছেনা, রাস্তায় মানুষ পেটাচ্ছে। নিজে না পারলেও, অন্য কেউ যেন নির্বিচারে ক্রসফায়ারে মানুষ মেরে দেয়, এই উল্লাস করছে। এই সবের মূলে সেই একই সমস্যা। এরা না চাইতেই জীবন নামের আশ্চর্য ঘুড়ি পেয়ে গেছে। লাটাই সুতোর ধার না ধেরেই একে যত্রতত্র উড়াচ্ছে। এই অনাচারে সবার দায় আছে।
 
আমি কোনো বিচার শাস্তির বিপক্ষে না। কিন্তু এক দুইজনকে না হয় জেল ক্রসফায়ার দিয়ে খালাস করা যায়, এই মব-লিঞ্চিং কি করে থামানো যায়? শাস্তি দিয়ে? কোনোদিন না। স্কুলের সামনে বাচ্চার মা’টাকে মেরে ফেলার সময়ের ভিডিওটার শব্দগুলা শুনছিলাম। মহিলাসহ অনেকে মিলে কি উৎসাহ দিচ্ছে, কেউ বলছে ‘ভাই একটু সরে দাঁড়ান, সবাইকে দেখতে দেন’। কি দিয়ে শাস্তি দিবেন একে? কোন উপায়ে? সার বেঁধে রিহ্যাবে নেয়া উচিত। আমার আপনার সবাইরই। একটা লম্বা সময় ধরে মানব শিশুর মস্তিষ্কের যুক্তিগুলোর যত্ন নেয়া হয় নাই। তার ফল এখন হাতেনাতে, রাজপথে রক্তে, ছোট্ট শিশুর ধর্ষিত দেহে।
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ npr.org

প্রথম পর্বঃ https://goo.gl/DjQvnp

দ্বিতীয় পর্বঃ https://goo.gl/DvBCNe

তৃতীয় পর্বঃ https://goo.gl/2iRBmC

চতুর্থ পর্বঃ https://goo.gl/YCEdJm

পঞ্চম পর্বঃ https://bit.ly/30NDE8C

Facebook Comments
পোস্টটি ৫৯০ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment