এই এখানে, মায়ার দহলিজে
লিখেছেন নীলজোসনা, আগস্ট 10, 2019 7:43 অপরাহ্ণ

জায়গাগুলোর অদ্ভুত নাম। পিহর, নাওতলা, জাগুরঝুলি। সময় করে যে দেখবো, তারও উপায় নেই। হুউশ করে পেরিয়ে আসছি এক একটা জায়গা। বৃষ্টিভেজা বাতাস, অদ্ভুত এক মাদকতাময় বিষন্নতা এনেছে।

গন্তব্যস্থান অচেনা না। শুধু পথটা প্রতিবার অচেনা লাগে, বদলে যায়। এই যে এই জায়গাগুলো, এগারো বছর হয়ে যাচ্ছে, কক্ষনো দেখিইনি। সময়ের এক একটা সাক্ষী তাদের নামগুলো। ছোট্ট অন্ধকার গাঁয়ের মধ্যে একটামাত্র টিমটিমে আলো, তার আঁচে টিনের প্ল্যাকার্ডে লেখা নামটা পড়া যাচ্ছে। হয়ত পাশেই একটা ফলের দোকান, কিংবা হোমিওপ্যাথির চিকিৎসক বসেন। অথবা চায়ের দোকান। এগুলো টং না। আসর জাঁকিয়ে বসা দোকান। দোকানের চেয়ে আসরের আকার বড়ো। সামনের বেঞ্চগুলো বহুল ঘর্ষণে মসৃণ। এক কোণায় বসা বৃদ্ধ গত রিটায়ার করেছেন। ওপাশের লোকটার কাঠের গুদাম আছে। সন্ধ্যা হয় হয়, বিক্রিবাটা মিলিয়ে দোকান বন্ধ করে বাড়ি এসে কাপড় বদলেছেন। এরপর জুতায় মশমশ শব্দ তুলে সোওজা ডাক্তারের দোকান। ডাক্তারের সাথে তাঁর বনে ভালো। আর একজন কাউন্সেলর নির্বাচনে হেরে যাওয়া প্রার্থী। রোজ আসেন, বেঞ্চের একটা কোণা তাঁর। লোকে রোজ তাঁকে ভরসাও দেয়, আবার নির্বাচন করার।

আচমকা ব্রেক করেছে বাস। মস্ত ট্রাক ঘোরাচ্ছে সামনে, তাই। কল্পনার জাল ছিঁড়ে হেসে ফেলেছি নিজের মনে। মাত্র দুই সেকেন্ড ওই আলো আঁধারে তাকিয়ে পিহর গ্রামটার এত্ত কিছু ভাবছি!

আর একটা ব্যপার অচেনা লাগে। ঈদে এখানে আসার সময় বাসার সবার মুখ। বিদায় আমি রোজ নিই। সকাল পৌনে সাতে, আম্মু স্যান্ডেল ফটফট করে এসে রুটির বক্স, নইলে পেয়ারা ব্যাগে দিয়ে চিৎকার করেন, ব্যাগের চেন আটকে যা! অফিস ফেরত আব্বু আসেন, মাঝেমাঝে এক সিঁড়ি উঠে তাকিয়ে দেখি দরজা লাগাই লাগাই ভাব করে উঁকি দিচ্ছেন। বন্ধের দিন রাতে বাচ্চাদের বালিশে রেখে, এক জোড়া চায়ের মগ ধুয়ে আম্মুর বাসায় যাই। ও মা, আধাঘণ্টা গল্প করেও পাছেপাছে আম্মু আসেন দরজায়। মাঝেমাঝে এক সিঁড়ি উঠে নিজেকে ধমক দেন, ধুরো আমি কই যাই? তবু এই বিদায়টার সময় ভারি অদ্ভুত লাগে সবাইকে। আব্বু, আম্মু, ছোটভাই, বোন, বোনের মেয়েটা, কেউ চোখে তাকায় না, পাছে টলটলে চোখে অনুরোধ দেখে ফেলি যদি? যে কর্তব্য নিজে করে দিয়ে বড় মানুষ হয়েছে আম্মু, বড় বোন, আমি যেন সেটায় না হড়কাই!

আর এখানে? ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটায় অপেক্ষাদের ভিড়। দুইদিন আগ থেকে ফোন, আর আসার দিন ত কথাই নেই। বাসে? কদ্দুর? এসে দেখি, আমাদের ঘরে টানটান বিছানার চাদরে সংসার পাতা। বাচ্চাদের দাদী মস্ত বটগাছ হয়ে মায়ায় জড়িয়ে বসে আছেন। আমার দিদুর মত। অথচ উলটো স্বভাবের। আকাশে ভরন্ত চাঁদ, এমন এক ঝলমলে চাঁদের রাতে এ বাড়িতে প্রথম এসেছিলাম।

মন দিয়ে ভাবলে আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর আর অসাধারণ মনে হয়, এই সম্পর্কের সুতোগুলোকে। তাই হয়ত, এসবকে ছিঁড়ে ফেললে আল্লাহ এত রাগ হন।

পয়সা দিয়ে কিনে দুই তৃতীয়াংশ গোশত মানুষকে দিয়ে দেয়া, মনের ইচ্ছার কি এক কুরবানী। সাথে সাথে সব মানুষ যদি অকারণ ইগো, জিভের ধার, জেদ, মিথ্যে গর্বকেও এভাবে কাত করে ফেলে শেষ করে দিতে পারতো? জামাই, বউ, বড় হয়ে ওঠা বাচ্চা, বুড়ো বাপ মা, ইসস, সব গুলো সম্পর্কের তখন একটাই নাম হত। আত্নীয়, আপনজন। আজকের দুনিয়ায় কুরবানীর শিক্ষাকে কাজে লাগানোর সম্ভবত সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র পরিবার, আত্নীয় স্বজন। আমাদের ঘরগুলো যদি সবগুলো জান্নাত হত!

Facebook Comments
পোস্টটি ৬১৪ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment