ইবরাহীম(আ.): ভাবনা জুড়ে
লিখেছেন নীলজোসনা, আগস্ট 27, 2018 1:36 পূর্বাহ্ণ

নিজে বাবা কিংবা মা হবার পর ছোটবেলায় দেখা কার্টুন কিংবা নার্সারি রাইমস, সবকিছুর অর্থ বদলে যেতে থাকে। যে টম এন্ড জেরী জীবনের প্রথম পঁচিশ বছর নির্দ্বিধায় গলধঃকরণ করেছি, আমার মেয়ে দেড় বছর বয়সে জিজ্ঞেস করলো, ‘আম্মু টম আরেকটা খালামণি ম্যাও দেখলে কেমন যেন করে, কেন? আর বুক থেকে হার্ট বের হয়ে হয়ে যায়, কেন?’ থতমত খেয়ে বন্ধ করে দিয়েছি। এই জানাটা দরকার, কিন্তু কোন কার্টুন চরিত্র থেকে বিকৃতভাবে না জানুক, এজন্য আস্তে আস্তে বন্ধ করতে হল।

রমাদান আসলে রমাদানের আয়াতগুলো, কুরবানী আসলে কুরবানীর গল্পগুলো পড়া হয়। আজকাল বাচ্চাদের বলাও হয়। টানা কয়েকদিন ঘুমের গল্প হিসেবে ইবরাহিম আলাইহি সালাম আর ইসমাঈল আলাইহিস সালামের গল্প বলার পর মনে হল, এর কয়েকটা দিক এতোদিন মিস করে গেছিলাম।

এখন খুব চোখে আটকাচ্ছে। কি ব্যাপার? আচ্ছা একটা ডিসক্লেইমার দিই। আমি এখানে শরয়ী ব্যখ্যা করছি না, কারণ আমার সেই শিক্ষাগত বা চিন্তাগত যোগ্যতা নাই। আমার ভাবনাকে উদ্বেলিত করেছে, এমন কয়েকটা কথা বলবো শুধু। 

প্রথম দিক, বিবি হাজেরার সাথে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের সম্পর্ক। ঊষর মরুতে নবজাতক পুত্রসন্তানসহ স্ত্রীকে রেখে আসছেন। হাজেরা পিছু ডাকলেন। ‘কেন রেখে যাচ্ছেন?’ ‘আল্লাহ বলেছেন’! ব্যাস, এইই। হাজেরা বেছে নিলেন এক ভয়াবহ অনিশ্চিত যাত্রা।

এখানে দুইটা ব্যপার। এক তো হল স্বামীর ওপর আস্থা। মনে রাখা উচিত, আল্লাহর নবী কিন্তু হযরত ইবরাহীম, তাঁর জীবনসঙ্গী নবী নন। চাইলে বলতেই পারতেন, ‘না থাকবো না এখানে। আমার তো দূরের কথা, বাচ্চার খাবার, পানির কোন যোগান নেই। আমাদেরকে নিয়ে যান।’ কি সুন্দর! আর একটা ব্যপার মনে হল। ভাবলাম, এখানে স্বামী তাঁর স্ত্রীর ওপর যে সিদ্ধান্ত আরোপ করছেন, সেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা, তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত না। স্ত্রী সেটি নিশ্চিত হলেন, আর এরপর বললেন, ‘তাহলে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না’। ফিরে গেলেন পুত্রের কাছে, যার পদাঘাতে তৈরী হবে এক দিগন্তপ্রসারী সভ্যতা, আর তাঁর আকুলতা ভরা পদধ্বনি কিয়ামত পর্যন্ত হাজীদেরকে সাফা মারওয়ায় সা’য়ী করাবে। কিসের ওপর ভর করে? ‘আমাকে যা বলা হয়েছে, তা আল্লাহর আদেশ’ এই আত্নবিশ্বাসের ওপর। ভাবছিলাম, আমরা বিয়ের সাথেসাথেই একে অন্যের ওপর বৈধ অবৈধ নানান আবদার চাপিয়ে দিই। স্বামী বা স্ত্রী দুইপক্ষই এই কাজটা করি। ‘এটা আমার মায়ের আদেশ’, ‘এটা আমার পরিবারের রীতি’, ‘আমার এইসব পছন্দ না একদম’ ইত্যাদি। স্বভাবতই অপর পক্ষেরও মাথা নোয়াতে কষ্ট হয়। কারণ, এ তো আরেকটা মানুষের পছন্দ। অথচ কি সুন্দরই না দেখাতো, আমরা যদি আমাদের আমাদের পছন্দ অপছন্দ নির্ধারণের কাঁটাটা আল্লাহর দিকে ঘুরিয়ে দিতাম! তাতে নিষেধ আর আবদারের মাত্রা যেমন কমে আসতো, সে ব্যপারগুলো মানাটাও কত সহজ হয়ে যেতো। মানুষের ইচ্ছে অনিচ্ছের কাছে নত হওয়ার চেয়ে আল্লাহর নির্দেশের কাছে নত হওয়া অনেক বেশি মর্যাদার, সম্ভব এবং তাতে সুদূরপ্রসারী কল্যাণের সম্ভাবনাও অনেক বেশি।

দ্বিতীয় বিষয় ইসমাঈলকে নিয়ে। একটা দশ বছরের ছেলে। কিইবা বয়স। বড় হয়েছে বেশিরভাগ মায়ের কাছে। বাবা একদিন কোথায় নিয়ে যাবেন বললেন, মা তৈরী করে দিলেন। গুটি গুটি পায় হাঁটছে। একটু পিছিয়ে গেছে, আর অমনি শয়তান এসে কানে শোনাচ্ছে, তোমার বাবা তোমাকে মেরে ফেলবে, দেখো! ছোট্ট মানুষ, কি বুঝেছেন ইসমাঈল? পাথর কুড়িয়ে দুষ্টু শয়তানকে তাড়াতে থাকলেন। কুরবানীর জায়গায় গিয়ে পিতাকে বললেন, ‘আপনি আমাকে বেঁধে নেন, নইলে আমি হাত পা ছুঁড়বো। আর আপনার চোখও, নইলে মায়া লাগবে’। আশ্চর্য না? ইসমাঈল তো নবী হবেন, আল্লাহ তার মধ্যে বীজ দিয়ে দিয়েছিলেন। এ বিষ্ময় বালক তার গোড়ালীর আঘাতে সভ্যতার সূচনা করেছে, ঐতিহ্যের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু কি সেই যোগসূত্র?

কেন সে বাবার লক্ষ্যের জন্য নিজের অত বড় ক্ষতি করতে রাজী হয়ে গেছে? আমার বাচ্চাকে পারবো আমি? হয়তো আমার অফিসের একটা প্রোমোশন, হয়ত একটা ফাইনাল প্রেজেন্টেশন, এভাবে আমার জন্য নিজেকে একদম দিয়ে দিবে? কি সম্পর্ক ছিলো তাঁদের বাবা-ছেলের? কি করে ছেলেকে বুঝিয়েছিলেন, নিজের জীবনের মিশন। এ ব্যপারে খুব বেশি কিছু পাওয়া যায়না। 

কিন্তু পরের একটা গল্পে আটকে গেলাম। যে গল্পে, যুবক ইসমাঈল পিতার সঙ্গে কাবার পুনঃনির্মান কাজ করছিলেন। তাই তো! সন্তানকে কাছে রাখা, কেন কি করছি এর অর্থ জানানো, হাতে হাতে তার হাতে নিজের স্বপ্ন তৈরীর ইঁট তুলে দেয়া। বাহ! এ সবই ত আধুনিক প্যারেন্টিং এর মূলমন্ত্র।

আর ইসমাঈলের মায়ের দিকে তাকাবেন না? হাজেরা পানি না পেয়ে সাফা-মারওয়ায় দৌড়ে গেছেন। একই সাথে আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখছেন, সাহায্য চাইছে্ন এবং তাঁর সন্তানকে ভালোভাবে লালন-পালনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। বর্তমান পরিস্থিতির অযুহাত দেখিয়ে চুপচাপ বসে ছিলেন না। এই অফুরন্ত যমযম হাজেরার পেরেশানীর নিশানি।

আবার ভাবতে গিয়ে চোখ খুললো, আরেক জায়গায়। এটা তৃতীয় বিষয়। ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দু’য়াগুলোতে। ভাবতে পারেন, আমাদেরকে দেখেন নি যিনি, সে তিনি সেই কত শতাব্দী আগে, আড়াই হাজার বছর আগে, অকাতরে আমাদের জন্য দু’য়া করে গেছেন? কি দু’য়া? আসেন জানি একটু। শিহরিত হচ্ছিলাম, এর কিছু অংশ আল্লাহ কি সুন্দর করে কবুলও করে নিয়েছেন, ভেবে। –

“হে আমাদের প্রতিপালক। আমাদের উভয়কে তোমার একান্ত অনুগত কর এবং আমাদের বংশধর হতে তোমার এক একান্ত অনুগত উম্মত বানাও”।

আল্লাহ তাঁকে এই চাওয়াটা পুরোপুরি ফেরত দিয়েছেন। শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামসহ প্রায় সকল নবীকে তাঁর বংশ থেকেই বাছাই করা হয়েছে। ভাবেন দেখি, আমরা নিজেদের বাচ্চাদের পর আর দু’য়া প্রসারিত করি? তাদের সন্তানদের জন্য? –

“হে আমার প্রতিপালক, একে নিরাপদ শহর কর।” 

ঠিক, মক্কা এখন হারাম শহর। এখানে রক্তপাত হারাম, এখানে হানাহানি হারাম।

“হে আমার প্রতিপালক। আমাকে ও আমার বংশধরদের নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানাও।”

না, শুধু নামাজ আদায়কারী না। আমি অবাক হচ্ছিলাম, বাচ্চারা নামাজে দাঁড়াতে শিখেছে যখন, আমি হাত তুলে চেয়েছি, আল্লাহ যেন ওরা এর ওপর থাকে, নামাজকে ভুলে না যায়। কিন্তু ‘প্রতিষ্ঠাকারী’? এ তো আলাদা মর্যাদা। সে শুধু একা পড়বে না, অবকাঠামো রেখে যাবে, যেন অন্যরা পড়ে। শুধু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভাবলেও মনে হয়, আল্লাহ যেন অক্ষরে অক্ষরে তাঁর প্রিয় বান্দা ইবরাহীমের এই দু’য়া গ্রহণ করেছিলেন।

আপনি আমি বাচ্চা পালি। মানুষের বাচ্চা খুব নাজুক হয়ে আসে পৃথিবীতে। অসহায়, চলচ্ছক্তিহীন। অন্য প্রাণীদের মত ভূমিষ্ঠ হয়েই তিড়িংবিড়িং লাফাতে জানলে হয়ত আরও কম সময় কোলেপিঠে ঝুলিয়ে রাখতাম। শরীরটাকে বড় করার জন্য, সুস্থ রাখার জন্য প্রাণপাত করি। আদর্শ বাবামা ভাবি নিজেদের। সন্তানের মাথায় চিন্তা রোপণ করি কি? বুনে দিই কি ভবিষ্যতের চিন্তা? শেখাই, জীবনের লক্ষ্য আল্লাহকেই খুশী করা? তার কচি হাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে আল্লাহর কাছে চাই একসাথে? যেমন ইবরাহীম চাইতেন?

একজন স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে, একজন বাবা বা মা হিসেবে, ইবরাহীম আলাইহিস সালামের গল্পটা বেশ নতুন স্বাদের লাগছে এখন। মনে হচ্ছে, কত কি করি নি। কত কি ভাবার ছিলো, ভেবে দেখি নি। উর্ধ্বে তোলা দুই হাতে, ওরা ভালো থাকুক, এই আকাঙ্ক্ষার সাথে আরও সুদূরপ্রসারী চিন্তা করে চাইতে হবে। আসুন চাই। আমাদের সন্তানদের কেউ সভ্যতার জন্ম দিক, অথবা খুঁজে নিক তার মত আরও কর্মী হাত, সভ্যতা সংস্কৃতি বিনির্মানের জন্য।

Facebook Comments
পোস্টটি ১৪৮৭ বার পঠিত
 ২ টি লাইক
৪ টি মন্তব্য
৪ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. নিজেকে নিজে প্রশ্ন করতে শেখাটা খুব দরকার। গুড রিমাইন্ডার। নীলজোসনা এভাবেই দ্যুতি ছড়াক।

  2. ঈদেষ আগের জুম্মায় কাটাবন মসজিদে পড়েছিলাম। খতীব হুজুর খুতবায় বাবা-ছেলের এই অনুভূতিগুলোর ব্যাখ্যা করছিলেন খুব সহজ ভাষায়।

  3. কত সুন্দর ভাবনাগুলো। শুকরিয়া।

  4. যেই গল্পটা ছোটবেলা থেকে সাধারন ভাবে জানতাম, আজ তা অসাধারন ভাবে বুঝলাম।

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment