আমাদের ভুলে, আটকানো জটা সময়ের
লিখেছেন নীলজোসনা, জানুয়ারি 15, 2020 11:27 পূর্বাহ্ণ
দুনিয়া ভর্তি ডানে বামে কেবল সমালোচনা আর সমালোচনা। সবাই বিচার করছে, কেউ সুবিচার, কেউ অবিচার, কেউ ইচ্ছেমতো অনাচার। অনেক ছোট বেলায় পড়া একটা কমিক গল্পের কথা মনে আছে, বাবা ছেলে একটা গাধা নিয়ে বাজারে বিক্রি করতে যাচ্ছে, গাধার পিঠ খালি। কে যেন মন্তব্য ছুঁড়ে দিলো,’নবাবী গাধা নাকি, পায়ে হেঁটে গাধার পিঠ খালি রেখে যাচ্ছে?’ এইবার দুইজনই চড়ে বসেছে, আরেকজন বললো, ‘দুইজনে মিলে গাধাটাকে মারবে এবার!’ বাবা বসে ছেলেকে দড়ি দিয়েছে, মন্তব্য আসলো, ‘বুড়ো একা মজা নিচ্ছে, বাচ্চা ছেলে হেঁটে মরছে’। ছেলে গাধার পিঠে বসেছে একা, এইবার ত আর কথাই নেই, ‘ঘোর কলিকাল, জোয়ান ছেলে আরাম করে, বুড়ো বাপের খবর কে রাখে!’ বেচারারা অবশেষে গাধার পায়ে দড়ি বেঁধে, লাঠিতে ঝুলিয়ে দুইজনে লাঠির দুই মাথা কাঁধে নিয়ে বাজারে গেছে।
 
এই থেকে শিক্ষা কি? লোকের কথায় কান দিতে নেই। আজকালকার ‘মোটিভেশনাল স্পীকার’রা এই কথাটা আরও সুন্দর করে বলেন। ‘বি ইয়োরসেলফ’, মানে নিজেকে জানো। আর সেই নিজেটাকেই অক্ষত রাখো। আসলেই কি তাই?
 
সমালোচনা যারা করেন, লোকের ভুল যাঁদের যখন চোখে পড়ে, তাদের ব্যপারে সাবধানবাণী আছে। কাউকে শুধরে দেয়ার কাজটা জটিল। না তার অগোচরে অন্য কাউকে বলা যাবে, ‘বাবা রে বাবা, কিভাবে এমনটা পারে? আমরা বাবা এইসব পারিই না’। আবার সামনাসামনি তাকে নিয়ে বিদ্রূপও করা যাবে না। চেনা নাই, জানা নাই, আন্দাজে এক গাদা মানুষের দিকেও নালিশের তীর ছোঁড়া যাবে না। ভদ্র ভাষায়, একাকীত্বে, এমনভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে যেন সে মনে আঘাত না পায়, আর এর পর শোধরানোর ভারও তার কাঁধেই দিয়ে দিতে হবে। এবং সর্বোপরি, না শোধরানোর ফলশ্রুতিতে সে জাহান্নামে চলে যাচ্ছে কি না সে বিচারের দায়িত্বও ‘মালিক ই ইয়ামিদ্দীন’ এর জন্য রেখে দিয়ে নিজের কাজে মন দিতে হবে।
 
আর উল্টোদিকে? যদি কেউ আমার ভুল ধরিয়ে দেয়? শয়তান এখানে একটা মজার কাজ করে। কানে কানে বলে, ‘খুব যে বাবা আমার ভুল ধরছে, এহ নিজে কি করে আমি কি জানি না?’ ‘আমার মেয়ে খারাপ, তার ভাইয়ের ছেলেটা কি কান্ড করলো বলবো একবার?’ মোট কথা, ভুলের অনুভূতিটাকে আমার মনের মধ্যে কোন ঢেউ তুলতেই দেবে না। আচ্ছা, যদি বা স্বীকারই করি যে, ‘হাঁ ঠিকই ত করি এমনটা’। তৎক্ষণাৎ মনে এনে দেবে আরেক চিন্তা, ‘এভাবে বললো কেন? আরেকটু ভালো করে বলতো যদি? যাহ, থাকুক, পাত্তাই দেবো না’। আমি হয়ত ভুলেই যাবো, বুঝিয়ে বলাটা তার কর্তব্য ছিলো, আর আমার কর্তব্যতে তাতে ঢিল পড়ে না।
 
আমার কর্তব্য কি?
 
নিজেকে শুধরানো, সহজ কাজ। একদম না। শয়তান এই কাজটা করতে পারে নি। নিজের ভুল বোঝার পর মাথা নুইয়ে স্বীকার করতে পারে নি। ইবাদতের অহংকার, ফেরেশতাদের নেতা হবার অহমিকায় উলটে আল্লাহর ভুল ধরেছে, ‘আমি আগুনের, কেন আমাকে বললেন মাটির আদমকে সিজদাহ্‌ করতে?’ সত্যি কথা বলতে, আমি আমার জীবনে নিজের যতগুলো সত্যিকারের ভুল বের করেছি নিজের, সবগুলো অত্যন্ত কর্কশ ভাষায়ই হয়ত আমাকে ধরিয়ে দেয়া হয়েছিলো। এই ত্যাগ মারাত্নক। কেউ একজন তার নিজের বাম কাঁধের কাজ করেছে, আমার সমালোচনা করে, আর আমি পেয়ে গেছি শুধরে ফেলার সুযোগ। হ্যাঁ, ‘বি ইয়োরসেলফ’ খুব সত্যি কথা। আমাদের স্বভাবের খুব কম দিকই আমূল বদলে ফেলার মত থাকে। বরং স্বভাবের ভালো দিকগুলোকেই আমরা অবহেলায়, অযত্নে, অনাচারে নষ্ট করে ফেলি। কারও কথায় সে ফিরে আসার রসদ যেনো পাই, সেই দরজাটা কিংবা অন্তত একটা জানালাও খুলে রাখা খুব দরকার। আত্ন অহমিকায় যেন ধুয়ে মুছে পবিত্র হয়ে যাবার পথটা বন্ধ করে না দিই, নিজের জন্য এইটুকু শুধু চাই।
ছবিঃ দুরাশা এর বাংলা ব্লগ
Facebook Comments
পোস্টটি ৪৯২ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment