নতুন আলো
লিখেছেন উম্মে জয়নাব, নভেম্বর 2, 2018 2:58 পূর্বাহ্ণ

সন্ধ্যার পর আকিয়াবে বেড়াতে এসেছেন জয়নাব,সাথে পরিচারিকা ইলমা।বন্দরের চারপাশ আলোয় ঝল-মল করছে,দূর থেকে মিষ্টি হাওয়া ভেসে আসছে।ফ্লাস্কে গরম চা,পছন্দের বিস্কিট ও আছে সাথে।ইলমা কাপে চা ঢেলে চিনি,দুধ আলাদা ট্রেতে রেখে, সাজিয়ে পরিবেশন করলো সে।জয়নাব চা তৈরি করে নিলেন এরপর আয়েশী ভঙ্গিতে একটু একটু উপভোগ করছেন।হাতে পছন্দের একটা বই,বলা যায়,কর্মব্যস্ত জীবনে বই আর চা, এ দু’টি বেশী প্রিয় তার। এ চায়ের একটা ইতিহাস আছে।আরাকান স্বাধীন হওয়ার পর,বাংলাদেশী প্রফেসর বান্ধবীর সাথে সিলেট বেড়াতে গিয়েছিলেন জয়নাব।সেখানে টি-গার্ডেন,জাফলং,পাহাড়ী এলাকা ঘুড়ে, ততোদিনে চায়ের পোকা হয়ে যান।এরপর,দেশে ফিরে আসার পর, সেই বান্ধবী প্রতিবছর তার জন্য সিলেটী চা পাঠান।সপ্তাহে রবি,সোমবার বেড়াতে আসতেই হবে।নতুন প্রতিষ্ঠিত ইউনি’র কাজে এ দু’টা দিনই অবসর।
প্রফেসর জয়নাব মগ্ন তার লাইব্রেরীতে, কি একটা অ্যাসাইনমেন্ট আছে।ইলমা খেতে ডেকেও ফিরে গেলো বার কয়েক।সেও জানে কাজপাগল মানুষটার বেঁচে থাকার সংগ্রামটা,এতো সহজ ছিলো না।লেম্রু নদীর তীরে ঘেষে শিক্ষকদের জন্য নির্মিত ভবনগুলো তার পাশেই ম্রাউক -উ রাজবংশের স্মৃতি জাদুঘর।আর তার পাশেই আরাকান ইউনিভার্সিটি।স্বাধীনতার মধ্যে বপশ কয়েক বছরের মধ্যেই প্রতিষ্ঠা পায় এটি।ও আই সি ‘র সহযোগিতায় আর এ ইউনি’র অন্যান্য নিবেদিত প্রাণ কর্মী জয়নাব।জানালা থেকে নদীতে ভেসে চলা যানগুলো দেখা যাচ্ছে,মিটি মিটি আলোয় ভেসে চলা একটা দু’টা নৌকাও দেখা যাচ্ছে। এতো মনোরম পরিবেশে থাকতে পেরে,সর্বদাই কৃতজ্ঞতা আদায় করেন আল্লাহর কাছে।সেদিনকার নাফ নদীতে নৌকায় কাটানো স্বতন্ত্র সময়গুলোতে কথা ভাবেন।কীভাবে পরিবার-স্বজন নিয়ে বাংলাদেশ এসেছিলেন।ক্ষুধার কষ্টে ছোট ভাইটি মারা যায়।খোলা আকাশের নিচে বৃদ্ধা মাকে নিয়ে কতো রাত যে জোসনা আলোয় কেটে গেছে।তবু সবুজ দেশটার প্রতি আমৃত্যু শ্রদ্ধা,ভালোবাসায় বুকটা ভারী হয়ে আসে।দীর্ঘ কতোটি বছরের স্মৃতি আজও তাজা, সতেজ হয়ে ঘুড়ে বেড়ায়। ডায়েরীর পাতা স্মৃতিকথায় ভরে উঠে।১৭৮৪ সালের পর আজকের আরাকান স্টেট আসলেই বিস্ময় জাগায় মনে।বার্মা শাসক গোষ্ঠীর নির্যাতন-নিস্পেশন, বঞ্চনার দিন আর নেই।ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে সকালে যখন পতাকা উত্তোলন করা হয়।ছাত্রীরা শপথ নেয় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার, তখন জয়নাবের মনে আনন্দের হিল্লোল বয়ে যায়।নতুন শিক্ষার্থীদের সাথে গল্প করেন,সংগ্রামী এক জাতির।যেখানে স্বাধীনতার পূর্বে তারা উচ্চশিক্ষারই সুযোগ পেতেন না,মেয়েরা বাসায় শুধু কুরআন হিফজ করতেন।

বিশ্ববিদ্যালয় আর্কাইভে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন,জয়নাব সাথে সহকারী মিসেস জামিল। সেমিনারে সাক্ষাতকার নিচ্ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী নারীদের। এক বোন বলছিলেন,তার স্বামী -সন্তানের নিঁখোজ হওয়ার কথা।কীভাবে তার বোনদের বর্বরদের হ… করা হয়েছিলো।সবচে’ স্পর্শকাতর ছিলো তার শিশু সন্তানের ভয়াবহ মৃত্যু। হঠাৎ রুম থেকে চলে এলেন মিসেস জয়নাব, সোজা সিড়ি বেয়ে ছাদে চলে এলেন,তারপর….

পিছনে ফেলো আসা সেই সন্ধ্যাটি, আহনাফের বাবা লিবারেশন ফ্রন্টে যোগ দিলেন।আর ফিরে এলেন না।আর ফিরে এলেন না।আর আহনাফ ও বড় হয়ে বাবাকে খুঁজতে বাংলাদেশে চলে এলো।এদিকে মিসেস জামিলও হাঁপাতে হাঁপাতে ছাদে এসে দাড়ালেন।পিছন থেকে কাঁধে হাতে রাখলেন,জয়নাব কেঁদে ফেললেন ঝরঝর করে। জীবনপ প্রথম তাঁকে কাঁদতে দেখলেন মিসেস জামিল। কী নিঃশব্দ সেই কান্না,কিন্তু, তার সাথে কী প্রতীক্ষাই না মিশে ছিলো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ স্বাধীনতা -সংগ্রামের সঠিক তথ্য-সংগ্রহে তৎপর।নতুন বিভাগে খোলা হয়েছে স্বাধীনতা -সার্বভৌমত্বের উপর বৃত্তি, ফেলোশীপ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।দেশের নতুন তারুণ্যকে সার্বভৌমত্বকে রক্ষায় সচেতন করে তুলতে।প্রফেসর জয়নাব সাংস্কৃতিক চর্চায় বেশ কড়া নজর দিয়ে থাকেন,তার শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মুক্ত রাখতে, তিনি প্রাচীন রাজবংশে প্রচলিত অনেক ইনডোর গেইমের ব্যবস্হা করেছেন।নিজেও মেয়েদের সাথে গলফ,খেলতে মাঠে চলে যান।স্বপ্নিল মানুষ স্বপ্ন দেখেন তার দেশকে নিয়ে। বিশ্বের বুকে মাথা উচু করে দাড়াবে, যে দেশকে অনেক দেশ একটুকুও নিশ্বাস নিতে দিতে চায়নি।কী অসম্ভব কষ্ট,ক্ষোভ লুকিয়ে আছে বুকে, সেই দুর্অহ সময়ের।চোখের তারায় ভাসে সকাল-বিকেল-

সীমান্তের কাটাতারের অন্ধকার
বুকের গভীরে সন্তান পাজাকোলে,
বৃষ্টিতে ভেজে অশ্রুভেজাদৃষ্টি,
চাঁদের আলোয় স্বপ্ন বোনা
অনবদ্য অমোঘ দিনগুলি।

ডায়েরীর পাতা বন্ধ করে,উঠে দাড়ানপ্রফেসর জয়নাব।গল্পের পর গল্প, লিখে রেখেছেন নতুনদের জন্য।ভবিষ্যতের মাঝে হারিয়ে যাওয়া প্রিয়তমকে খুঁজে বেড়ান।কবিতার পর কবিতা বুনে চলেছেন।কতোটা দৃঢ়তার সাথে এতোদূরের পথ পাড়ি দিয়েছিলেন।ইউনিভার্সিটির আবাসিক বাসা থেকেও,দূরে দাড়িয়ে থাকা নিশানটি দেখা যায়।তিনি এক দৃষ্টিতে আছেন,বাতাসের ছন্দে দুলতে থাকা নিশান আর তিনি।

(লেখাটি ২০১৭সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি লেখা,যখন রোহিঙ্গাদের নিরাশ্রয়,দূর্বিষহ অবস্হা প্রকট ছিলো,লেখাটি যাতে হারিয়ে না যায় ,তাই…টুকে রাখা।)

Facebook Comments
পোস্টটি ৫৫৭ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
২ টি মন্তব্য
২ টি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. থিমটা তো অসাধারন,আরেকটু গোছানো দরকার। বুঝা যাচ্ছে লেখক এই থিমে অনেক ভালো জানেন,লেখা আরো বেশি আশা করছি।

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment