তোমারেই করিয়াছি জীবনেরই ধ্রুবতারা
লিখেছেন উম্মে জয়নাব, মে 17, 2020 11:46 অপরাহ্ণ

         জানালায় পড়ন্ত রোদের আলো আছড়ে পড়ছে ক্লান্ত হয়ে,অফ-হোয়াইট রঙের পর্দাটা দুলছে একটু একটু করে।মুনিয়া’র অভিমানী মনের পর্দা সরে এসে কেমন আকাশ সমান শূন্যতা এসে বসে পড়লো মনের মাঝে।কার উপর অভিমান করেছে মিষ্টি মেয়েটা!বর অফিস থেকে তাড়াতাড়ি আসবে বলে এখনো একবার ফোন করলো না বলে!নাকি প্রিয় বান্ধবী একবার টেক্সট করেনি বলে!নাকি ননদিনীর সাথে খু…শুটি করে,মান-অভিমান!নাকি প্রিয় ইউনি’ হলের সামনে অনেকদিন ফুসকা খায়নি বলে!এসবের কোনটাই মুনিয়ার মনভারী করেনি!আজ তার শুধু মায়ের কথাই বারে বারে মনে পড়ছে!নিজের উপরই অভিমান হচ্ছে তার!বুকটা এমন খা খা করছে কেন তার!ব্যথা বাজছে গহীন কোনে!এতোদিন পর নির্ঝরিণীর মতো উৎসারিত হচ্ছে এ অনুভব মুনিয়ার কাছে যেন বড়ো দুর্লভ!

সকাল নয়টা থেকে বিকেল চারটা, স্কুলশিক্ষিকার ব্যস্ত জীবনে মায়ের রাশভারী অথচ প্রশান্ত ব্যক্তিত্বের শাসনে স্কুল জীবন পার করেছে মুনিয়া।পঞ্চম শ্রেনিতে আম্মা নিতেন সমাজবিজ্ঞান ও গনিত,ক্লাসে প্রথম হয়েও সবসময় তটস্থ থেকে মুনিয়া।গনিত পরীক্ষা শেষে অনিবার্য থাকতো বকুনী, শিক্ষিকা মায়ের থেকে স্বজনপ্রীতির বদলে পেয়েছে কড়াশাসন,কখনো নিজ কন্যার নম্বর বাড়িয়ে দেননি,পরীক্ষার প্রশ্ন তো নয়ই।সততার প্রশ্নে এক চুল সরে আসতে দেখেনি মুনিয়া,তার আম্মাকে। চলার পথে মুনিয়াকে এ বিষয়টা অনেকখানি প্রভাবিত করেছে ও নৈতিকতাসমৃদ্ধ জীবন যাপনে সহায়ক হয়েছে।ব্যক্তিস্বার্ধের কারনে নিজের আত্মসম্মান, সততাকে নষ্ট হতে দেয়নি সে।

স্কুল-কলেজ জীবনের নস্টালজিয়া দিনগুলো শেষে, ইউনি’ লাইফের বিপুল ঐশ্বর্যময় জীবনের হাতছানি। শাসন,বকার বাইরে পথচলার এক অপূর্ব অনুভব এসে মোহিত করে রেখেছিলো অনেককাল।এই বুঝি বাঁধনহারার গান,সবুজ ক্যাম্পাসে পা ফেলার দিন…কোন অবসরে আম্মার কাছ থেকে দূরত্ব বাড়ার দিন শুরু হয়ে গেলো বুঝতে পারেনি।একাডেমিক পড়াশোনার শেষে নতুন দাম্পত্য জীবনে, নতুন করে বউটুবানি’র জন্ম হলো।ছুটির শেষে মুনিয়া’র মাতৃক্রোড়ে ফেরা হয় না সহজেই।আজকাল একটা স্মৃতি তাড়া করে ওর মাথায়,খুউব মনে আছে,ছোট্টবেলায় মুনিয়া নানুভাইয়ের নেওটা ছিলো,স্কুলের সব ছুটির দিনগুলোতে তাকে নানুবাড়ি থাকতেই হবে।একবার মুনিয়া’র আম্মু তাকে নিতে পাঠিছিলেন,কিন্তু মুনিয়া লুকিয়ে ছিলো।আজ অনেকবছর পর সে ভাবে,স্মৃতিময়তা এক বিস্ময়,একই স্মৃতি কখনো মধুর,কখনো বেদনার।ইশশ,সেদিন আম্মুর কাছে কেন ছুটে গেলো না….!আজ তার খুউব ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে আবার,সেই বকা,সেই ধমক সেই অনেক সময় ধরে মায়ের আশেপাশে টুনটুনির মতো উড়ে বেড়ানো,লুকোচুরি খেলবে শৈশবের মতো।

ক্যাম্পাসের সাথে হল জীবনের বন্ধন কেমন মায়াময়,হল ছেড়ে আসা প্রতিটি মেয়েই জানে।মুনিয়া যেদিন হল ছেড়ে নতুন বাসায় এসেছিলো,পুরোটা পথ কেঁদেছে নীরবে,এক সপ্তাহ ঠিক করে খেতে পারেনি,যেন বাপের বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে এমনতর অনুভব কিংবা তারচে’ কঠিনতর।মুনিয়া গভীর করে ভাবে,ওর আম্মার আবেগ প্রকাশে নেই বাড়াবাড়ি,হলে আসবার সময়ে গোপন অশ্রু কণা মুছতে দেখেছে আড়ালে,কন্যা যাতে মানসিকভাবে ভেঙ্গে না পড়ে।নারীমনের এমন পরিশীলিত আবেগ প্রকাশে আর কাউকে দেখেনি সে,ইউনি’ ভর্তি পরীক্ষায় প্রথমবার যখন ভালো সাবজেক্ট এলো না, সবাই হতাশারা কথা বললেও, আম্মা শক্ত করে আগলে রেখেছিলেন তাকে।কোয়ারেন্টাইন কখন শেষ হবে,একছুটে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে হয় মুনিয়া’র। মনটা যখন খুব অশান্ত হয়ে যায়,লিখতে বসে যায় সে,আজও তার ব্যতিক্রম হলো না….মায়ের কাছে চিঠি লিখছে সে,
মা,তোমার সখী হবো আবার…
আম্মু, তোমার সাথে আমার প্রথম বন্ধন,জাগতিক পরিচয়,যেদিন তোমার রেহমে আমি এলাম সেদিন থেকে আমাদের আত্মার বন্ধন কিংবা আরো অনেককাল আগে থেকেই।আমি তোমার বড্ডা,আমার যতখানি বয়েস,তোমার মাতৃত্বের ঠিক ততোখানি বয়েস।তোমার উচ্চারিত শব্দমালায় আজকের আমার এই চিন্তাশক্তি,লেখনির বুনট।তোমার কাছে আজন্ম ঋন আমার,কিছুই পারিনি দিতে তোমায় আম্মু।জানি,দিয়ে যেতে পারাই তোমার প্রত্যাশা,বিনিময়ে কোন আকাঙ্ক্ষা কোনকালেই তোমার ছিলো না। শৈশবে যেমন হাত ধরে হাটতে শিখিয়েছিলে,তেমনি হাতেখড়ি হয়েছিলো তোমার কাছেই।শিক্ষাজীবনের প্রথম শিক্ষকও তুমি ছিলে।আমাকে রেখে যখন দীর্ঘ মাস পিটিআই ট্রেনিং এ ছিলে,কতো কষ্ট হয়েছিলো তোমার,তাই না!আদৌ কি তোমার কষ্টদের ছুঁতে পারি মা,নাকি আমার কোলজুড়ে ছানাপোনারা আসলে আরো গভীর করে বুঝবো, তোমার শান্ত অথচ প্রগাড় চোখের ভাষা পড়তে পারি আজ,চোখ বুজলেই চোখে ভাসে,রবীঠাকুরের কথা ধার করে বলি,নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে,রয়েছো নয়নে নয়নে….।
আজ মনে পড়লে খুব হাসি পায়,ছোটবেলায় এতো মিল্ক ক্যান্ডি খেতুম যে দুধদাঁতের অবস্হা বারোটা বেজেছিলো।কতো বয়াম চকলেট এনে রেখে যেতে,স্কুল ক্লাস করছো তখন,বাসায় আমার জন্য মন পড়ে থাকতো তোমার।এমনি করে কখন যে বড়ো হয়ে উঠলাম নিঃসঙ্গচারীনি হয়ে জানিনে,গল্পের বইয়ের পাতায় মুখ লুকিয়ে নিজস্ব কল্পনার রংধনু জগতে হারিয়ে গেলাম।

কর্মজীবনের ব্যস্ততায়ও সকালে আমাদের খাইয়ে বের হতে তুমি,রান্না সামলে, পরীক্ষা খাতা দেখতে দেখতে চুলোয় তরকারী চেখে এসেছো,আমার এলোমেলো চুলে বিনুনি গেঁথে দিয়েছো।তারপরও,আমি তোমার সান্নিধ্য পাওয়ার অভিযোগে অভিমান করেছি….

মাতৃত্ব কি আসলেই সহজাত?নারী মানেই কি মায়ের জাতি?প্রেম-মায়ার বন্ধনে বালিকাবধূ, প্রেমময় নারীই একদিন মা হন।কাম-প্রেম,ভালোবাসার কি অপার্থিব বন্ধন!প্রতিটা নারীর পথচলা অনন্য,অন্যরকম সুন্দর।কর্মজীবী মায়ের শ্রম-প্রচেষ্টা কতোখানি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছি জানি না।তোমার দেওয়া সঞ্জীবনী সুধা আমি দু’হাতে অকুণ্ঠ চিত্তে পান করেছি।নানুআপুর কাছে একবার শুনেছিলাম( তোমার অগোচরে) সেমিস্টার ফাইনাল,কোর্স ফি এসব কারনে বেশ কিছু টাকা দরকার হয়েছিলো,মাসের শেষ কিন্তু জোর করে আবার টাকা পাঠিয়ে দিলে,বললে তোমার হাতে পর্যাপ্ত টাকা আছে,কিন্তু দীর্ঘ সময় তুমি পায়ে হেটে বহুদূরের স্কুলে ক্লাস নিতে গিয়েছো হাতে ভাড়ার টাকা ছিলো না বলে,আমাকে জানতে দাওনি কখনো,জানি এমন হাজারো গল্প না বলা রয়ে যাবে,এমন উত্তম কাজের বিনিময় শুধু আল্লাহ তায়ালাই দিতে পারেন।

এরপরও,আমার অভিমান, অভিযোগের কালো মেঘ ঝড়ো হয়েছে,প্রত্যহ হলের গেটে কতো মা ভীড় করেন,তোমার আসবার অবসর হতো না,এখন তো বুঝি,
হলে এসে পছন্দে খাবার খাইয়ে দিতে পারোনি ঠিক পছন্দের ফল গাছের পাকা পেয়েরা ঠিকই, মনে করে বাবার ব্যাগে গুঁজে দিয়েছো আমার জন্য।

তোমার শাসনের মাঝে লুকানো সোহাগ আঁচ করতে পারিনি পুরোপুরি কখনো।ঘামে ঝরানো প্রতিটা দিন,আমাদের বড়ো করে তুলেছো এখনো আগলে রেখেছো,এরচে’ উত্তম সাদাকা কি হতে পারে!
কখনো যদি অভিমানের ঝুরি খুলে লিখতেই বসে যাও,কর্মক্লান্ত দিনে কেমন নিসঙ্গ অনুভব করেছো, তখন তোমার আত্মজার নুপুরের নিক্বণ শুনতে চেয়েছিলে, রাতে বুকের পাশে কন্যার তপ্ত নিশ্বাসে ক্লান্তি ভুলতে চেয়েছিলে!মাকে কাছে না পেয়ে ভালোবাসায় কমতি পড়বে নাতো….এমন শত কর্মজীবী মায়ের কষ্ট ভরা অনুভব নিয়ে।ভালোবাসার যে শত রঙ!এমন রঙে কাব্য কে লিখলেন এমন সুন্দর করে…!

আমিও ডায়েরীতে লিখছি এখন,অগগন অনুভব,ভালোবাসার চিঠি,জানি আম্মা লাজুক বিনয়ী স্বভাবে কিছু প্রকাশ করবেন না।কোন এক গভীর রাতে হয়তো পাতা মেলে দেখবে এই ডায়েরী আর চোখ মুছবে!সাথে আরো অবাক হয়ে দেখবে, মুক্তোর মতো অক্ষরগুলো যেন তোমারই হাতের লেখার অনুরূপ। মেয়েটার হাতের লেখা একদম তোমারই মতো!তোমার শরীরের একটা অংশ, তোমার আদরের মুনিয়া!

আম্মু,তোমার সখা হবো আমি আবার,খুউব করে রান্না করে খাবো দুজন,ঘুরতে যাবো দুজন মিলে….কতো জমানো কথা এই ছোট্ট বুকটাতে।তুমি সপ্তাহ শেষে যেমন নানুআপুর কাছে ছুটে যেতে,আমারও আজ খুউব সেরকমটা ইচ্ছে হয়।স্কুলের ছুটির দিনটা শুধু তুমি আর আমি,আমাদের।

ইতি,
আদরের রাজকন্যা

এমনি করে চিঠি লিখে চলছে মুনিয়া,ফোনকলে এমন নিবিড় আলাপনে দুজনেই আনাড়ী,তবু জায়নামাজে কতো না-বলা কথাই না বলে যায় স্রষ্টার কাছে,ইশশ মুনিয়ার বাসা যদি ঠিক মায়ের বাসার কাছাকাছি হতো,রবের কাছে চাইবার কোন বাঁধা নেই…।

মুনিয়া’র একটা ছোট্ট গিফট আইডিয়াও আছে,বিকেলে বাড়ান্দায় বসে মাকে এগিয়ে দেবো একমগ চা,মগটার গায়ে লেখা আছে খোদাই,করে,”Amma,You are My Jannah.”

#আমার_আমার_আমার_মা

# women_express 

Facebook Comments
পোস্টটি ৫৩৮ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment