কৃতজ্ঞতা
লিখেছেন উম্মে জয়নাব, নভেম্বর 8, 2018 4:25 অপরাহ্ণ

হাফিজ সাহেব চেয়ে আছেন গরুটার দিকে, কী সুন্দর চোখদু’টো টানা টানা।অকৃত্রিমতায় জড়িয়ে আছে, তার মাঝে আছে মাতৃত্বের ছায়া।আজ এতোকিছু বিষয় ভাবার সময় মিলেছে তাঁর।যাপিত জীবনে হয়তো এমন বিস্তর ভাববার বিষয় আছে,যা হয়তো অনেকে অপ্রয়োজনীয় কিংবা বালখিল্য মন করতে পারেন।অবসর জীবনে বিস্তর সময় পেয়েছেন বলা যাবে না,তবুও আজ বিকালটা একদম একলা প্রহর।চারিতে কতোগুলো খৈ,ভুসি-ভাতের মাড় পানিতে মিশিয়ে দিয়েছেন,গাই আর তার বাছুরটা কেমন মজা করে খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছে। তিনি গাইটার গলায় আদর করে দিলেন,প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতায় তার চোখটা আরো বেশী কাজলকালো হয়ে উঠেছে।কান্না আসার পূর্বে যেমন চোখ ছলছল হয়ে ওঠে, ঠিক তেমনি যেন।হাফিজ সাহেবের মনটা হঠাত কেমন খারাপ হয়ে উঠলো, মানবমনের কষ্টগুলো যেন এমনই।হঠাত মেঘের আনাগোনা,তারপর ঝুপঝাপ বৃষ্টি,কখনো হয়তো বা মেঘের গুড়ুমগুড়ুম।

গোয়ালঘর পার হয়ে এসে, টিউবওয়েলে হাত-পা ধুয়ে বারান্দায় এসে বসলেন তিনি।মেয়ে শাহরিনের জন্য হঠাত মন খারাপ হয়ে উঠেছে।হাফিজ সাহেব ছিলেন বেসরকারি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক,আজীবন সৎ থেকেছেন কর্মজীবনে,মানুষের ক্ষতি করার চিন্তাও করেননি কখনো।ছেলে-মেয়ের কষ্ট করে কায়ক্লেশে লেখাপড়া শিখিয়েছেন,শহরে হোস্টেল রেখে পড়াতে হিমশিম খেলেও,হাল ছাড়েননি,সঞ্চিত জমিজমা বিক্রি করে ফরমফিলাপের টাকা পাঠিয়েছেন।বড় ছেলে আজ বড় অফিসার, সুখী সংসার তাদের।কলিজার টুকরো মেয়ে শাহরিনকে বিএ পাশ করিয়েছেন শহরে রেখে,তারপর পাত্রস্থ করেছিলেন।কিন্তু,ঐ বুঝি তার কাল হলো,প্রিয় কন্যার বিচ্ছেদ নয়,তার জীবনের স্বপ্নের মৃত্যু।

বিয়ে-সুখী দাম্পত্য এগুলোকে কি ভাগ্য বলবেন নাকি,অন্যকিছু তিনি জানেন না।হাফিজ সাহেব কখনো স্ত্রীর হক আদায়ে পিছপা হননি,প্রবীন জীবনে এসেও একসাথে হেটে চলেন সুন্দরের পথে সঙ্গীনিকে নিয়ে।কিন্তু, শাহরিন কি পেয়েছিলো তেমনটি, বিয়ের পর আশফাকের  মধ্যে কেমন পরিবর্তন। হাফিজ সাহেবকে দেওয়া ওয়াদা সে রাখেনি,শাহরিন ছিলো মেধাবী ছাত্রী।হাফিজ সাহেব নিজে তাকে মাস্টার্সে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন,কিন্তু আশফাক কিছুতেই রাজী হলো না।আশফাক নিজেও চাকুরে ছিলো,নতুন সংসারে তেমন চাপও ছিলো না,যে নতুন বৌয়ের পড়াশোনা বন্ধ রাখতে হবে।হাফিজ সাহেব নিজে খরচ দিতে চেয়েছিলেন,জামাইয়ের ঘোর আপত্তিতে আর তিনি বাধ সাধলেন না।প্রিয় সঙ্গীনির স্বপ্নগুলো পায়ে দলতে বুঝি, একটুও বাধেনি ওর।নতুনের আগমন ঘটেছে ইতিমধ্যে, শাহরিনের বড় কন্যা মিতুল। কেমন মিষ্টি বড়ো বড়ো কাজল কালো চোখ,ঠিক যেমনটি হাফিজ সাহেবের পোষা গাইয়ের চোখ।নাতনির জন্য হাফিজ সাহেব যথাসাধ্য উপকৌটন নিয়ে হাজির হলেন,আশফাক সালাম দিয়ে কাজে চলে গেলো।হাফিজ সাহেব ভাবলেন, সে কি কন্যা হওয়ায় খুশি না,নাকি তার আগমনে মুখ ভারী।শাহরিন এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে,সালাম দিয়ে কন্যার কপালে চুমু খান।মেয়ের হাতে বাড়ি থেকে আনা ফল-মূল,গাইয়ের দুধ,মিষ্টি-দইয়ের ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে,নাতনির কাছে ছুটে যান।
মিতুলকে কোলে নিতেই কি মিষ্টি হাসি,দাতবিহীন  মাড়ি দিয়ে এমন অপার্থিব হাসি।কেমন হৃদয়ে যেন ঝংকার তোলে।বারবার কোলে নিতে ইচ্ছা হয়,শাহরিন চাইলেই তো বারবার আসতে পারে না।বাসায় আশফাক কি খায় না খায়, এমন আনাড়ী সে রান্নার ক ও জানে না।বিয়ের পর দু’একদিন শাহরিনকে হেল্প করতে গিয়ে পুরো তরকারীর বারোটা বাজিয়েছিলো।
এরমধ্যে আবার শাহরিন নতুন চাকুরীটার জয়েনের অ্যাপয়েন্ট লেটার এসেছে হাতে।মিতুলকে নিয়ে, চাকরী সংসার সামলে, হয়তো বন্ধের দিনে একটু অবসর  তার।হাফিজ সাহেব নাতনি জন্য দুধেল গাই কিনেছিলেন,কিন্তু পোষার লোকের অভাবে গাই বিক্রি করে জামাতাকে অর্থ দিয়ে দেন।আশফাক এতে হ্যা ও করেনি,না ও করেনি।শাহরিন আবার খুব মনখোলা,কোন উপলক্ষ্য হোক কিংবা এমনি মিতুল,আশফাকের জন্য ড্রেস, বাবা-মায়ের পছন্দের জিনিস কিনতে পছন্দ করে।আশফাক এতে মনে হয় বিরক্ত হয়,বলে এতো কিছু কিনতে হবে কেন?ওনার ছেলেরা তো আছেই,তোমার কি দরকার, এতোসবে।শাহরিন অবাক হয়,বাবা-মা’কে পছন্দের জিনিস গিফট করা,প্রয়োজনে সাহায্য করাটা কি অন্যায়।আর, সেতো নিজের সংসারের পিছনেই সব ব্যয় করছে,নিজের শখ-আহ্লাদে উড়িয়ে দিচ্ছে না।আশফাক দিন দিন কেমন যেন হয়ে উঠে,শাহরিনের কাছে বারবার হিসেব চায়,কোন খাতে কি খরচ করেছে সে,এইসব নিয়ে দিনরাত খিটিমিটি।কেমন কর্তৃত্ব ঘাটাতে শুরু করে,মিতুলের সামনে শাহরিনকে গালিগালাজ করে।অথচ,পিতা হয়ে মিতুলের ভাল-মন্দের দিকে বেখেয়াল সে।দিনদিন তার দায়িত্বহীন আচরন একপেশে হয়ে উঠে,খামখেয়ালীপনা।কারনে-অকারনে ঝগড়া করে শাহরিনের সাথে।হাফিজ সাহেব এলেন,মিতুলদের বাসায়, আশফাক- শাহরিনদের মধ্যে বিবাদ মীমাংসা করে দিতে,আশফাক বলল, সে চায় না,তার স্ত্রী স্বাধীনভাবে বেতন খরচ করুক,এতে নাকি তার কর্তৃত্ব খর্ব হয়।হাফিজ সাহেবকে বললেন,মিতুল-শাহরিনের ভালো চান তো,চেকটা যেন তার হাতে তুলে দেয়, এমাস থেকে।হাফিজ সাহেব অবাক হন,কেমন অদ্ভূত আচরন তথাকথিত শিক্ষিত মানুষগুলোর,স্ত্রী আয়ে ভোগদখল করার,অথচ নিজের স্ত্রী-কন্যার দায়িত্বের ব্যাপারে উদাসীন।অথচ,কুরআনে নারীদের ভরনপোষনের পুরুষদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।স্ত্রীদের সম্পদ অর্জন  ও তা ব্যয়ের অধিকার রয়েছে,সেখানে পুরষের হক নেই, যে তাতে হস্তক্ষেপ করে।কিন্তু আশফাক শিক্ষিত হয়ে কেমন ছোটলোকের মতো আচরণ করছে,ভাবতেই মনটা বিষিয়ে ওঠে।কি আর করবেন হাফিজ সাহেব এতোসব বলেও জামাতার অভাজন হলেন,মিতুলের সুন্দর বড়ো হওয়ার কথা চিন্তা করে,আর কিছু বলতে পারলেন না।

শাহরিন ব্যালকনিতে বসে চুপচাপ বসে আছে,বিয়ের প্রথমদিনের কথা মনে করতেই, বিষন্ন একটা হাসি মুখে এসে জড়িয়ে যায়।নতুন চাকুরীতে জয়েন করেছিল আশফাক তখন,বিয়েতে ধার্য মোহরানা অর্ধেক খুশিমনে সে তাকে দিয়ে দিয়েছিলো।বাকী টাকাও পরে আশফাকের ব্যাংকেই জমা ছিলো,শাহরিন একদিন সে টাকা তুলে এনে,মিতুলের জন্য একটা গয়না গড়াতে চেয়েছিলো।আশফাককে সেকথা বলতেই বললো, অফিসে কিছু ধার-দেনা পড়েছিলো, তাই আর কি,ও টাকাটা আর জমা নেই!শাহরিন আকাশ থেকে পড়েছিলো,কিন্তু কিছু বলব না
ওর সাথে কোন বাধ-প্রতিবাদ করলে খারাপ আচরণ পেতে হয়।তারচে, বন্ধের দিন বাবার বাড়ি থেকে ঘুরে আসুক মিতুলকে নিয়ে।আশফাককেও বলেছিলো আসতে,কাজের দায় দিয়ে এড়িয়ে গেলো।রিকশা ডেকে দিয়ে,শুধু ওদের তৈরি হতে বললো।শাহরিন আর মিতুল বিকেলে গিয়ে নামল, নানুর বাসায়।মিতুল ততোদিনে বেশ হাটতে শিখেছে,মায়ের কোল থেকে গুলুগুলু পায়ে নানার কোলে এসে উঠলো।মিতুল এখন বেশ ফল-ফুল,প্রজাপতি,পশুপাখির নাম শিখেছে।
একটু দূরে লালগাই আর তার বাছুরটা দাড়িয়ে আছে দেখে,মিতুল বলে,”নানুভাই,গরু যাবো,লাল গলু!”মিতুলও নানুর কোলে বসে গরুটার ঘাড়ে,গলায় আদর করে দেয়,আদরে গদগদ হয়ে গরুটা মিতুলের গা ঘেষে থাকে।বন্ধের এ কয়দিনে মিতুলের সাথে গাইটার বেশ ভাব হয়ে গেছে।

মিতুলের নানীর শরীরটা তেমন ভাল নেই।গত মাস ধরে চোখের ব্যথাটা বেড়েই চলেছে,হাফিজ সাহেব চিন্তিত হয়ে পড়লেন,ডাক্তার বলেছেন,ডান চোখটাতে ছানি পড়েছে,দ্রুত অপারেশন করানো দরকার,না হলে কি হয় বলা যাচ্ছে না।বড়ছেলে টাকা পাঠিয়েছে,কিন্তু হসপিটালে থাকা,আসা সবমিলিয়ে  এতো ধকল সামলানো,বেশ কিছু অর্থের প্রয়োজন পড়ে যায়।শাহরিন আব্বাকে কিছু টাকা পাঠাতে চায়,কিন্তু আশফাক কিছুতেই রাজী হলো না।শাহরিন নিজের লুকানো কিছু হাত খরচের অর্থ নিয়ে এসেছিলো,কিন্তু হাফিজ সাহেব নেননি।আবার, মেয়েকে কস্টও দিতে চাননি,কিন্তু আত্মসম্মানের জালে আটকে গেলেন।নিজে সারাজীবন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে কাটিয়েছেন,কোন হীনতা-দীনতা স্হান পায় নি সেখানে,আজও তেমনি অটল রইলেন।দোয়া করলেন, আশফাকের হীন মানসিকতা যেন আল্লাহ পরিবর্তন করে দেন।

হসপিটাল থেকে বাড়ি আসলেন।হাত একদম খালি তার।সোজা গোয়াল ঘরের দিকে ছুটলেন তিনি।গাইটা এসে আদর পেতে মাথা নুইয়ে দিলো,তিনিও অনেকক্ষণ আদর করলেন,আজই হয়তো তার শেষ আদর।গাই আর বাছুরটাকে বিক্রি করে দিয়েছেন দালালের কাছে।কাল হয়তো এসে নিয়ে যাবে।পরদিন ক্রেতা এসে গাইটা নিয়ে গেলেন,পথে একবার চোখ ফিরে থমকে দাড়ালো অবুঝ পশুটা,ওমন কাজল কালো চোখে কি বলতে চাইছে সে,হাফিজ সাহেব কি জানেন।এতোদিনের ভালোবাসা দিয়ে পোষা প্রানীটার কৃতজ্ঞতার ভাষায়,তার চোখ থেকে গড়িয়ে পড়লো, কয়েক ফোটা উত্তপ্ত অশ্রু।কিন্তু,তার পৌরষের রক্ত-ঘামে গড়া কন্যাকে গড়ে অন্যের কাছে তুলে দিয়ে, তিনি কি পেয়েছেন?

৩০জুন,২০১৮

Facebook Comments
পোস্টটি ৪৪৫ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
১ টি মন্তব্য
একটি মন্তব্য করা হয়েছে
  1. আহহ! এ যে কি কষ্টের তা বাবা-মা আর মেয়েটাই বুঝে। কেন আমাদের মেয়েদের জন্যে একটা ভালো মানুষ পাওয়া এতো কঠিন?!!

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment