অনুরণন
লিখেছেন উম্মে জয়নাব, এপ্রিল 19, 2019 11:54 অপরাহ্ণ

শৈশবের দিনগুলো এতো মিষ্টি মধুর কেন হয়,তানহার জানা নেই।ওর মনে হয়, এমন কোনো দুঃখী মানুষও নেই পৃথিবীতে, যার শৈশব এ সুন্দর স্মৃতি নেই।বড়ো হয়ে মানুষগুলো কেমন কর্মব্যস্ত, বেখেয়ালি হয়ে যায়।তানহাও কি জানতে পেরেছে, ক্যাম্পাস,ক্লাস,অ্যাসাইনমেন্ট,আড্ডার মাঝে আব্বুকে সময় দেওয়া খুব কম হয়।তিনিও কাজের চাপে খোজখবর নিতে কম পান সময়।আবার,হয়ত বা তিনি জানেন না, তার আদরের মেয়েটা যে তাকে কত্তো মিস করে,আর নীরবে অভিযোগের পাহাড় গেঁথে বসে আছে।তানহার ক্যাম্পাসে,হলে বারদুয়েক এসেছেন তিনি,তাও খুব স্বল্প সময়ের জন্য।কিন্তু,তানহা আব্বুকে নিয়ে ঘুরবে,সারা ক্যাম্পাস,মজার মজার খাবার খাওয়াবে,সন্ধ্যায় হলদে আলোয় গল্প করবে দু’জন।বলবে,”আব্বু জানো,তোমার নাতনিকে কিন্তু অক্সফোর্ড -এ পড়াবো,অনেক বড়ো হবে সে।”রজনীগন্ধা গাছগুলোতে ফুল ধরেছে কী না?গায়ের কলেজটার কি অবস্হা?ছোট্টুতা পড়াশোনা কেমন চলছে?কতোশতো প্রশ্নই না আসে মনে, তানহার।স্কুল, কলেজ জীবন থেকেই তানহা স্বল্পভাষী,ভীড় এড়িয়ে চলতে পছন্দ করে,ছেলেদের সাথে তেমন কথা হয়না।যা প্রশ্ন করার স্যারদের থেকে জেনে নিতো।চিন্তারাজ্য তার স্বপ্নেরা পাখা মেলতো,গান গাইতো অনবরত।

তানহা কি কখনো তার বাবার মেয়ে হতে চেয়েছে,কিংবা বাবার মত,মনের খেয়ালে হয়তো।একটু কড়া চায়ের সাথে আদার ঝাঝ মিশানো,এক কাপ চায়ের মতো।সবাই বলে,তানহা তার বাবার মতো হয়েছে, শরীরের বলিষ্ঠ গঠন,সবকিছু।তা অবশ্য,তানহা জুতো কিনতে গেলেই টের পায়।আম্মা তো বলেন,”তোমার জুতো হাতে বানিয়ে আনতে হবে।”আজ একা জুতো কিনতে এসে,খুব মনে পড়ে কথাগুলো,আনমনে হাসে।

দ্বিধা,সংকোচের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে, মানুষের আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়।যেখানে বাসা বাধে অবিশ্বাসেরা,হতাশা।ইতিবাচক দিকগুলো যখন, কালো অন্ধকারের চাদরে ঢেকে যায়,হৃদয়ের কোমলতা দূরে পালিয়ে যায়।

এভাবেই সময়ের আবর্তনে, অনার্স প্রথম বর্ষ,দ্বিতীয় বর্ষ শেষ।একদিন সকালে, তানহার বান্ধবী মাহজুবা’র বাবা মারা গেলেন,সকলে মিলে বেচারীকে সমবেদনা জানালো।কিন্তু,তানহার চুপচাপ, নীরব,শুধু ভেবে চলেছে।কারো উপস্হিতি কতো জরুরি হতে পারে মানুষের জন্য,তার অনুপস্থিতি অসহায় করে দিতে পারে চারপাশ।বিষন্নতার সরোবরে ডুবে সে,ভালোবাসার নীলপদ্মের খোঁজে হাতড়ে বেড়ায়।

তানহার আজকাল বেশ শৈশবের কথা মনে পড়ে,রোজ ভোরে মক্তবে পড়তে যেতে বেশ আলশেমী লাগতো তার।আব্বুর যন্ত্রনায় কখনও ফযরের সালাত পর ঘুমাতে পারেনি,বাজঘাই নাদে তার ঘুম খানখান হয়ে যেতো,তারপর রেহেল আমপারা নিয়ে একদৌড়ে মাসজিদের বাড়ান্দায়।শীতের সকালবেলার কথাগুলো আরো নির্মম,তানহা ক্লাস এইটে তখন,ওর ছোট ভাই তালহা ক্লাস টু।ভোরবেলা উঠে জোরে জোরে পড়তে হতো দুজনের, যাতে পড়া ভুল হলেও আব্বা বলে দিতেন পারেন।মাঝে মাঝে তো তিনি জিজ্ঞেস করতেন,তোরা পড়ছিস তো…?বই সামনে নিয়ে তানহা-তালহা সেই ঘুম,বাবার বকুনির ভয়ে ঘুমের মাঝে পড়া আওড়ে যাচ্ছে।চোখ মেলে যখন আব্বা দেখতে পায়,তিনি বলেন,”যা জট করে টিউবওয়েল থেকে হাতমুখে পানি ছিটিয়ে আয়।”স্কুলমাস্টারের সন্তানের কি আর রক্ষা আছে,পড়াশোনা তো তাদের পৈতিকসূত্রে পাওয়া, অন্যদের মাফ হলেও তাদের কি আর রেহাই আছে।শৈশবের দিনগুলোর কথা ভেবে যেন কেমন হাসি পায় তানহার,মন ভারীও যে হয় না,তা না।
হলের গেসটরুমে সকালবেলা থেকে কেমন ভীড় পড়ে যায়,বেলা অবধি থাকে।দূর-দূরান্ত থেকে কতো আত্মীয়-স্বজন আসেন, হাতে থাকে গ্রাম থেকে নিয়ে আসা,নাড়ু, মুড়ি-মুড়কি,মায়ের হাতের সুগন্ধি ইলিশ,কিংবা ভুনা মাংস,পিঠা-পুলি।এতোসব নিয়ে তানহা ভাবে না,আড়চোখে হয়তো সে তাকিয়ে থাকে মেয়েকে দেখতে আসা, বাবার চোখেমুখে কি মায়া,কি অপার্থিব স্বর্গীয় অভিব্যক্তি, দৃষ্টি ফেরাতে পারে না।বাবা -মেয়েকে যখন কাঁধে হাত রেখে মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে যান,তানহার চোখের কোনটা কেমন অকারনেই সিক্ত হয়ে আসে।পথের ক্লান্তি গায়ে না মেখেই,কন্যাদের রাগ-অভিমানই বুঝি বাবাদের মন ভরিয়ে দেয়।সেও হয়তো ভাবে এমন রৌদ্রময় দিনের কথা,কিন্তু,তার রাগের কাছে কন্যার স্নেহ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা চাপা পড়েছে।রাগী জেদী স্বভাবের কারণে তানহা বাবার কাছে খেলনার আবদারও করেনি কখনো।
বড়মামার পরিবার খুব তাড়িত করে তানহাকে,কাজিন তানজিমাকে দেখে কেমন ঈর্ষা হয় মাঝেমাঝে।বাবাভক্ত প্রাণ তেমনি,বড়মামাও তানজুম বলতেই অজ্ঞান। অফিস থেকে ফিরলেই তানজুম দৌড়ে গিয়ে বাবার ব্যাগটা নেয়,পানি এগিয়ে দেয়।কপালে চুমু একে দেন,তার সোনা মামনিটাকে।কেমন প্রশান্তি লেগে থাকার মতো দৃশ্য।কলেজের গন্ডি পেরিয়ে তানহা যখন অনার্সের ছাত্রী, তখন তার দেখার চোখ, চিন্তার স্রোতে ঢেউ এসে লাগতো নতুন করে।নতুন করে দেখার চোখ,যে চোখ শুধু ভালোবাসা খুঁজে পায়।ইতিবাচকতা,আশাবাদীতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখলো সে।ক্যাম্পাসের সবুজ ঘাসে সবুজ মনের পাখিদের সাথে তার বন্ধুত্বের নীড় বাধলো সে।ক্লাসমেট আতিকা, তানহার জীবনে বন্ধু,অভিভাবক দু’টোই, বলা চলে।হতাশা-গ্লানি দলে সুন্দরের পথে চলার হাতেখড়ি তারই হাতধরে।সহনশীলতার সাথে কারো মতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে কর্তব্য করে যাওয়ার পাঠও তারই হাতে।তানহা মাঝে মাঝেই বাবার কথা,পরিবারের কথা বলতো,হয়তো অলক্ষ্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলতো।আতিকা এ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়,তানহা যেমন বাবার কাছে ভালোবাসা কামনা করে,তানহার বাবা হয়তো প্রকাশ ভঙ্গি,নিরবতায় সেটা আড়াল হয়ে যায়।কিংবা,সন্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন দরকারে তানহাও অগ্রগামী হতে পারে। তানহাও ভাবে ভালোবাসার বরফ গলিয়ে দিবে সে,নতুন কোন ভাবে।রোজ বাবার খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য ফোন দেয়,কখনো বা ক্লাসের গল্প করে,কখনো বা নিজের স্বপ্নের কথা বলে।তানহার বাবা ফোনে একদু কথা বলে, আর কথা খুঁজে পান না।রোজকার মতো কন্যার খোঁজ নিয়েও অভ্যস্ত নন।তানহার গল্পে ইতিবাচক সাড়া না মেলায় বেচারা মুষড়ে পড়ে।তানহা ভাবে,ভালোবাসা প্রকাশ কি দূর্বলতা? আব্বু কেন গল্প করেন না,ফোনে,সবাই কত্তো কত্তো কথা বলে।আতিকা এসে বললো,”কারো আব্বার সাথে তুলনা করিস না,তোর বাপ ঠিক তোর বাপই।ওনার জন্য বেশী করে দোয়া করো,খেয়াল রেখো,এবার চলো তো ঈদে তাঁর জন্য সুন্দর একটা পাঞ্জাবী কিনি,আব্বুর জন্যও কিনবো,তারপর আমি ট্রেনে উঠবো রে,কুরবানীর মাংস ভুনা আমার হাতে না হলে,আব্বু খেতেই চান না।”তানহা রাজী হয়ে বলে,চল চাচার পাঞ্জাবী আমি পছন্দ করি,তুই আব্বুরটা…..।”
বাইরে কেমন বৃষ্টি হচ্ছে, ঝুপঝাপ,রাজধানী শহরের আবহাওয়ার ভাবটাই কেমন যেন।তানহা বারান্দায় গিয়ে দাড়ায়।পাশের রুমে সঙ্গীত বিভাগের একজন ছাত্রী, বৃষ্টির সময় তার গান গাইতে নাকি বেশ লাগে।আজও এর ব্যতিক্রম হয়নি,গুনগুন করে ভেসে আসছে যে গানটি,হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের,”আয় খুকি আয়,কাটে না সময় যখন আর কিছুতে…”গানটা শুনতেই,ছেলে বেলায় ফিরে যায় সে,সকালবেলা তানহা ও তার বাবা,নৌকা নিয়ে বের হয়ে যেতেন,তানহা চুপ করে বসে প্রকৃতির শোভা দেখে চোখ ভরাতো,তারপর ছোট নদীর দুকূল জুড়ে বড় হওয়া ছৈলা গাছের ফুল পেড়ে তানহা ফ্রকে গুটিয়ে নিতো সেসব ফুল,বাড়িতে গিয়ে ফুলগুলোর নিচের অংশ কেটে, প্লেটে সাজিয়ে রাখা হতো পরদিন ভোর বেলা মধু জমা হতো, সেই ফুলে।ভাবতে ভাবতে, তানহা বলে উঠে,”বাবা তোমাকে ভালোবাসি।”
তানহার বেশ মনে পড়ে,ইউনি’ ভর্তির সময় বাবা বেশ, নিমরাজী ছিলেন।মেয়েদের এতোদূরে পড়াতে দিতে রাজী ছিলেন না,বড়মামা, আম্মুর চাপে শেষপর্যন্ত রাজী হয়েছিলেন।আব্বু এ চারবছরে এসেছেনও মাত্র বার-কয়েক তাও কাজে।তানহা ভেবেছে,বাবাকে নিয়ে ঘুরবে,সারাদিন প্রিয় ক্যাম্পাস,শিক্ষক,বান্ধবীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে,কিন্তু সুযোগ হয়নি।বেশ কদিন পর তানহাদের সমার্তন অনুষ্ঠান,বাবাকে আসতে চিঠি লিখেছে।শিক্ষাজীবনের সর্বোচ্চ সনদ যখন বাবার হাতে দিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছিলো,ফুপিয়ে কেঁদে ফেলেছিলো তানহা।তানহার বাবাও লুকিয়ে কাঁদছিলেন,হয়তো?

অনার্স শেষ পরীক্ষা দিতেই আতিকাদের বাসা থেকে তানহাদের বাসায় প্রস্তাব এলো।আতিকার বড় ভাইয়ের জীবনসঙ্গী করে প্রিয় বান্ধবীকে চিরস্হায়ী করে নেওয়ার প্রয়াস।সবাই বেশ খুশিতে রাজী হয়ে গেলেন,সবকিছু এতো সুন্দর ভাবে মিলে যাওয়াতে বেশ শোকর আদায় করলেন সবাই।একমাত্র তানহার বাবা কিছুটা অরাজী, ছেলের বাসা সেই চট্টগ্রামে,দুদিনের পথ,আসা-যাওয়া সামাজিকতা মেইনটেইন করতে বেশ অসুবিধা হবে।কিন্তু,ওদিকে আতিকা, আর তানহার ছোট্টভাই তালহা সকলকে বুঝিয়ে-শুঝিয়ে একদম, রাজী করিয়ে ফেললো।শুভদিনে তানহার বিয়ে হয়ে গেলো।

বেশ কিছুদিন পর তানহার ছোট ভাই ভর্তি এক্সাম দিয়ে চট্টগ্রাম ইউনি’তেই ইংরেজী বিভাগে ভর্তি হয়ে গেলো।এর পিছনে তৃতীয় কোন ব্যক্তির ষড়যন্ত্রের হাত ছিলো কী না পাঠকই আঁচ করতে পারবেন।দুই পুত্র -কন্যার অবর্তমানে তানহার বাবা কেমন অস্হির হয়ে উঠলেন।স্কুল ছুটি নিয়ে ছুটে যান,সূদূর বরিশাল থেকে চট্টগ্রামের পথে।আবার,স্কুলে কাজের চাপ হলে অবস্হা এমন দাড়ালো,মাহমুদকে বেশ কদিন পরপরই তানহাকে নিয়ে, বেড়াতে যেতে হয়,শ্বশুরালয়ে।।তানহা বাবার এই আকুলতায় বেশ খুশিই হয়,জীবনের সবচে’ আকাঙ্ক্ষার ছিলো বাবার ভালোবাসা পাওয়া।আতিকা শুধু চোখ টিপে হাসে,বলে, “সই,আমার আব্বু কি তোমায় কম আদর করেন?আজই নালিশ করে,তোর শ্বশুরমশাইকে রাগিয়ে দিবো,কিন্তু।”তানহা আতিকাকে বলে,ইশরে,বাবাকে রাগিয়ে দিবে,এমন বকুনি খাবে না!”প্রিয় সইকে জড়িয়ে ধরে,তানহা বলে,তুমি ফুফি হতে যাচ্ছো।”আতিকা আলহামদুলিল্লাহ বলে, আরো জোরে জড়িয়ে রাখে তানহাকে।
নতুন মেহমান জয়নাবের আগমনে পরিবারে কেমন অনুরণন বইয়ে যায়।তানহার আম্মা-আব্বা ছুটে আসেন,নাতনিকে দেখতে, জয়নাবকে কোলে নিয়ে নানুভাই চুমু খান,আদর করেন।তানহা একটু অদূরে দাড়িয়ে, সেই ভালোবাসারই শিহরন বোধ করে হৃদয়ে।

Facebook Comments
পোস্টটি ৩৩২ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment