তায়েফ ভ্রমণ
লিখেছেন সাজেদা হোমায়রা, অক্টোবর 3, 2019 4:52 অপরাহ্ণ

‘তায়েফ’ দেখার আকাঙ্ক্ষা আমার দীর্ঘদিনের। ২০১৬ সালে সৌদি আরব সফরকালে তায়েফ দেখার সুযোগ হয়। নি:সন্দেহে এই সফরটি ছিলো আমার কাছে খুবই আবেগময়।

সেই তায়েফ! যেখানে আল্লাহর রাসূল সা. ছুটে এসেছিলেন ইসলামের দাওয়াত নিয়ে।
সেই তায়েফ! যেখানে ঘটেছিলো রাসূলের জীবনের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা।

এই তায়েফের সাথেই রাসূল সা. এর শৈশব স্মৃতি জড়িত। রাসূলের দুধ মা হালিমা তায়েফের মেয়ে ছিলেন। জন্মের পরই রাসূল সা. তাঁর দুধ মার সাথে তায়েফে চলে আসেন।

মক্কা থেকে ৭০ মাইল দূরে তায়েফ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬ হাজার ফুট উচ্চতায় এর অবস্থান। মক্কা, মীনা, মুজদালিফা, আরাফাত পার হওয়ার পরই শুরু হয় তায়েফের রাস্তা। পাহাড়ের ঢাল কেটে তৈরি করা হয়েছে দুই লেন বিশিষ্ট রাস্তা। একটি উপরে উঠার অন্যটি নিচে নামার। এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে যাওয়ার জন্য রয়েছে ক্যাবল কার।

পাহাড় ঘেঁষা আঁকাবাঁকা পথ ধরে গাড়ি উপরের দিকে চলছে…
সড়কের মনোমুগ্ধকর নির্মাণশৈলী আর পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য দেখছি আর উপরে উঠছি…
চমৎকার স্নিগ্ধ বাতাস!
পাহাড়ি পথের বাঁকে বাঁকে বানরের ঝাঁক!
পাহাড়ের কোলে তৈরি করা হয়েছে মনোমুগ্ধকর রিসোর্ট… বিনোদন পার্ক।
সব মিলিয়ে অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর এ নগরী।

সৌদি আরবের অন্যান্য শুষ্ক অঞ্চলের চেয়ে তায়েফের আবহাওয়া ভিন্নতর। দীর্ঘকাল থেকেই এখানে প্রচুর ফল উৎপাদন হয়। তায়েফের রাস্তার দু’পাশেই কিছুদূর পরপর দেখেছি ফ্রেশ ফলের দোকান।

মক্কার সাথে তায়েফের ব্যবসায়িক সম্পর্ক সেই প্রাচীনকাল থেকেই। তায়েফের সাথে যারা ব্যবসা করতেন তার মধ্যে বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসও ছিলেন। তায়েফের প্রধান মসজিদকে ‘আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস মসজিদ’ বলা হয়। মসজিদের পাশের কবরস্থানেই তাঁর কবর।

তায়েফের পথে পথে হাঁটছিলাম… আর রাসূলের জীবনের স্মৃতিগুলো মনে নাড়া দিচ্ছিলো।

রাসূল সা. মক্কা থেকে হেঁটে হেঁটেই তায়েফ এসেছিলেন ইসলাম প্রচারের জন্য। দশদিন তিনি এখানে ছিলেন। এসময়ে তিনি তায়েফের নেতৃস্থানীয় লোকদের ইসলামের দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু তারা রাসূলের দাওয়াতকে প্রচণ্ডভাবে প্রত্যাখান করেছিলো।
নিষ্ঠুর তায়েফবাসী রাসূল সা. কে তাদের শহর থেকে বিতাড়িত করে দেয় এবং পাথর মেরে তাঁকে রক্তাক্ত করে ফেলে। রাসূলের সাথে থাকা জায়েদ রা. রাসূল সা. এর জুতার সাথে রক্তাক্ত পা দেখে কেঁদে ফেলেন।
তায়েফবাসীর এ অমানবিক ও বর্বরোচিত নির্যাতন রাসূলের জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা।

আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে…
পাথরের আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়েও সেই কঠিন সময়ে রাসূল সা. আল্লাহর কাছে তাদের ধ্বংস কামনা করেন নি। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে কোনো যুদ্ধ ঘোষণাও করেন নি।
বরং তিনি তায়েফবাসীর জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন। “তারা বোঝেনা” এই বলে তিনি তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন।

ভাবতেই অবাক লাগে এতোটা তিরস্কৃত, অপমানিত ও লাঞ্ছিত হবার পরও আল্লাহর রাসূল তাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন!
কি অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ছিলেন তিনি!

তায়েফ সফরের পুরো সময়টাই খুব মনে পড়ছিলো, আঘাতে রক্তাক্ত হয়ে যাওয়া আমার প্রিয় রাসূলকে…. মনে পড়ছিলো কঠিন সময়ে তাঁর মুখে উচ্চারিত হওয়া সেই অসাধারণ দোয়াটা!

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই মহামানবের জীবনী যতোই জানছি ততোই তাঁকে আরো বেশি অনেক বেশি ভালোবাসতে ইচ্ছে করে………..

প্রিয় রাসূলের স্মৃতি বিজড়িত এই তায়েফ সফর আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে সারাজীবন!

Facebook Comments
পোস্টটি ৩৩১ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment