‘কাশ্মীরের গল্প’
লিখেছেন সাজেদা হোমায়রা, সেপ্টেম্বর 2, 2019 4:48 অপরাহ্ণ

মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর কাশ্মীরকে দেখিয়ে বলেছিলেন, “পৃথিবীতে যদি কোথাও স্বর্গ থাকে, তবে তা এখানেই আছে! এখানেই আছে!”

পৃথিবীর স্বর্গখ্যাত এ কাশ্মীর দেখার আকাঙ্ক্ষা আমার দীর্ঘদিনের।
প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতা! তিনি আমাকে তাঁর সৃষ্টি এ সৌন্দর্যপুরী দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন।

ভারতের সবচেয়ে উত্তরে চির বিতর্কিত এক জায়গা কাশ্মীর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাত হাজার ফিট উপরে সবুজ উপত্যকা আর শান্ত হ্রদ ঘেরা এক অতুলনীয় সৌন্দর্যপুরী।

কাশ্মীরের রাজধানী ‘শ্রীনগর’। শহরটি ঝিলাম নদীর তীরে কাশ্মীর উপত্যকায় অবস্থিত। শীতকালে শ্রীনগরে প্রবল শীতের কারণে কাশ্মীরের রাজধানী ছয় মাসের জন্য জম্মুতে স্থানান্তরিত করা হয়।

আমার স্বপ্ন যাত্রা শুরু হলো! দিল্লী থেকে শ্রীনগর। আকাশ পথে শ্রীনগরকে এতো সুন্দর লাগছিলো!
শ্রীনগর এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করার ১০/১৫ মিনিট আগে প্লেনের সব জানালা বন্ধ করে দেয়া হয় নিরাপত্তার জন্য।
শ্রীনগর এয়ারপোর্টটি ভারতীয় বিমানবাহিনীর মালিকানাধীন। ২০০৫ সালে এটি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট হিসেবে মনোনীত হলেও হজ্জ ফ্লাইটগুলো ছাড়া এখান থেকে কোন ইন্টান্যাশনাল ফ্লাইট পরিচালিত হয় না। ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে উত্তপ্ত পরিস্থিতি হলেই এ এয়ারপোর্টটি বন্ধ করে দেয়া হয়।

এয়ারপোর্ট থেকে বের হলাম….মুগ্ধ চোখে কাশ্মীর দেখছিলাম!
এই সেই কাশ্মীর!
সেই স্বপ্ন রাজ্য!

উঁচু উঁচু বরফে ঢাকা পাহাড়, নীল আকাশে মাথা গুঁজে থাকা পর্বত জুড়ে মেঘেদের খেলা, দুরন্ত ঝর্ণার নাচ, ছুটে বেড়ানো ঘোড়ার দল, স্বচ্ছ পানির নদী, বনভূমি, নয়নাভিরাম ফুল আর ফলের বাগান…..সবকিছুর এক অনন্য সংযোজন! যেন পৃথিবীর সব রূপ সৌন্দর্য ভীড় করেছে এখানে!
সত্যিই এক স্বপ্নের ভূস্বর্গ!

কাশ্মীরের সৌন্দর্যের আধার ধরে রেখেছে যে জায়গাগুলো তাদের মধ্যে শ্রীনগর অন্যতম। ঝিলাম নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দর এই শহরটির চারিদিক ঘিরে আছে বরফ মাখা বিশাল সব পাহাড়। শ্রীনগরের মূল আকর্ষণ ‘ডাল লেক’। পুরো ডাল লেকটাই যেন এক ভাসমান শহর। এই লেকের উপর ভেসে আছে শত শত হাউজ বোট আর শিকারা নামক নৌকাগুলো। ভেসে আছে সবজি বাজার, চায়ের দোকান, মার্কেট, অপরূপ ফ্লোরা আর ফাউনার বাগান!
শিকারায় করে অপূর্ব সৌন্দর্যের অধিকারী এই ডাল লেক ঘুরে দেখেছিলাম। দেখেছিলাম…কী মায়ায় আকাশ ছোঁয়া পাহাড়গুলো মেঘের সাথে মাখামাখি করে দাঁড়িয়ে আছে!
কী অসাধারণ মুগ্ধতা!

কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর স্বাস্থ্যকর আবহাওয়ার টানে শত শত বছর ধরে মুঘল বাদশাহদের ছুটি কাটানোর প্রিয় জায়গা ছিলো এটি। শ্রীনগরে রয়েছে বেশ কিছু মুঘল বাগান। বাগানগুলোতে এতো রঙের ফুল! দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়!

 

পাহাড়ের ভিতর আঁকাবাঁকা রাস্তা দিয়ে গিয়েছিলাম গুলমার্গ এবং সোনমার্গে। এ দুটো জায়গাই বরফের জন্য বিখ্যাত। চারিদিকে শুধু বরফের ছড়াছড়ি! বরফ ঢাকা পাহাড়ের চূড়া, বরফগলা পাহাড়ি নদী, ঝর্ণা…. কী অনিন্দ্য সুন্দর!
গুলমার্গে বরফাচ্ছাদিত পর্বতে ক্যাবল কার থেকে দেখেছিলাম পাকিস্তানের ‘আজাদ কাশ্মীর সীমান্ত’।

কাশ্মীরের আরেকটি অসম্ভব সুন্দর জায়গা ‘প্যাহেলগাম’। শ্রীনগর থেকে ১০০ কি.মি. দূরে নদী উপত্যকা শোভিত স্বর্গীয় একটি গ্রাম প্যাহেলগাম। স্থানীয় ভাষায় প্যাহেলগাম শব্দের অর্থ ‘ভেড়াওয়ালাদের গ্রাম’। প্যাহেলগাম যেতে পথে পথে দেখেছি সারি সারি আপেল বাগান, পাইন গাছ, বরফে ঢাকা পাহাড় আর জাফরান ক্ষেত। প্যাহেলগামের কাছাকাছি যেতেই দেখতে পেলাম বিখ্যাত ‘লিডার নদী’। পাহাড়ের গায়ে এঁকেবেঁকে বয়ে চলা এ নদীর সৌন্দর্য হৃদয়কাড়া!
নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ প্যাহেলগামকে মনে হচ্ছিলো আসলেই কোনো এক স্বর্গ রাজ্য!
প্যাহেলগাম থেকে ৬ কি.মি. দূরে অসাধারণ সুন্দর একটি জায়গা ‘বাইসারান’। দুর্গম উঁচু নিচু পাহাড়ি পথে ঘোড়ায় চড়ে গিয়েছিলাম বাইসারান। পুরোই একটা অ্যাডভেঞ্চার ভ্রমণ! এখন মনে হলে কেমন গা শিউরে উঠে!

৯৯% মুসলিমের দেশ কাশ্মীর। মুসলিম পরিচয় শুনলে তারা খুব খুশী হয়।বাংলাদেশের মানুষকে তারা খুব পছন্দ করে…পছন্দ করে বাংলাদেশের ক্রিকেট দলকে!

কাশ্মীর শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে নয়, খাবারেও ভূবনখ্যাত। নানান রকম সুস্বাদু খাবারের সমাহার এখানে!

কাশ্মীরের অন্যতম বড় রহস্যময়তা হচ্ছে এর আবহাওয়া। এই রোদ তো এই বৃষ্টি আবার কিছুক্ষণ পরই হয়তো তুষারপাত!

কাশ্মীরের ঈদ দেখেছি। ঈদের আগের দিনগুলোতে পুরো কাশ্মীর জুড়েই ছিলো একটা উৎসব মুখর পরিবেশ। মার্কেট,এটিএম বুথ,গোশতের দোকান, কনফেকশনারিতে ছিলো প্রচণ্ড ভীড়! দোকানে দোকানে ঈদ উপলক্ষে বানানো হচ্ছিলো কাশ্মীরি বিস্কুট।
ঈদের নামাজ পড়েছিলাম বিখ্যাত হযরত বাল মসজিদে। সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত এখানেই হয়েছিলো। ৫০ হাজারেরও বেশি মুসলিম এখানে ঈদের নামাজ পড়েছিলেন। ঈদের দিন রাস্তার দু’পাশে বিভিন্ন কাশ্মীরি খাবারের পসরা বসেছিলো।
ভালো লেগেছিলো খুব!

অতুলনীয় সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি কাশ্মীর আমার মন খারাপও করে দিয়েছিলো!

পুরো কাশ্মীর জুড়েই ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিশাল উপস্হিতি চোখে পড়েছিলো। রাস্তায় তারা শক্তি নিয়ে টহল দিচ্ছে। পথে পথেই সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট। তারা সতর্কতার সাথে অস্ত্র নিয়ে সজ্জিত!
কাশ্মীরের রাস্তার দেয়াল জুড়ে লেখা “We want Freedom! “
বাড়ি ঘরের সামনে মেশিনগানধারী সৈন্য, সাজোয়া গাড়ি, ট্যাংক… এসব দেখে আমার মন খারাপ হয়ে গিয়েছিলো!

কাশ্মীরের মানুষ স্বাধীন কাশ্মীরের স্বপ্ন দেখে! কাশ্মীরের মানুষদের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে, তারা ভারতের সাথে/ভারতীয় নাগরিক হিসেবে থাকতে কোনোভাবেই রাজি না। তারা খুব আক্ষপের সাথে বলছিলো…..” আমরা তো স্বাধীন না, স্বাধীন দেশের মানুষ তো নিজ ঘর, রাস্তা নিজেরাই পাহারা দেয়…কিন্তু আমাদের ঘর,রাস্তা তো মেশিনগানধারী সৈন্য পাহারা দেয়!”

প্রতিনিয়ত কাশ্মীরিদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে ভূস্বর্গ কাশ্মীরের রাজপথ! কাশ্মীরের মানুষ একটা শান্তিময় কাশ্মীর চায়! সহিংসতা থেকে মুক্তি চায়! কাশ্মীরের ছোট ছোট কিউট বাচ্চাগুলোর দিকে তাকিয়ে খুব মায়া লাগছিলো….কী আতঙ্কময় এক পরিবেশে বড় হচ্ছে তারা!
কী ভয়াবহ অশান্ত এক পরিবেশ!

কাশ্মীরের কথা মনে হলেই ভেসে উঠে মুগ্ধতা….ভেসে উঠে আতঙ্ক! প্রকৃতপক্ষে এ দুটি রূপই কাশ্মীরের বাস্তবতা।
ভালো লাগা আর মন খারাপ জড়িয়ে থাকা এই কাশ্মীর ভ্রমণ আমাকে মায়ার জালে আটকে ফেলেছে!
খুব মিস করি এ মায়াময় কাশ্মীরকে!

ভালো থেকো কাশ্মীর!

Facebook Comments
পোস্টটি ৭৯৯ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
০ টি মন্তব্য

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment