শেষ বিকেলের চা!
লিখেছেন হারিয়ে যাইনি, আগস্ট 3, 2020 3:38 পূর্বাহ্ণ

বিকালের নাস্তার সাথে আমাদের খুব একটা রোমান্টিক সম্পর্ক আছে, তাইনা? কেমন যেনো খেতে চাইনা চাইনা করে আবার খুব করে খেয়েও ফেলি অনেক কিছু! আজকে তাই বিকালের নাস্তা নিয়েই কথা বলবো। এইবেলার খাওয়াটা নিয়েই আমাদের অনেক বিপত্তি। সারাদিনের কাজের শেষে একেতো আবার চুলার আগুনের কাছে যেতেই মন চায়না, তার উপর আরেক ল্যাঠা হলো ‘কি বানাবো’ এই চিন্তা! আর চিন্তা-ভাবনা করে, শরীর ঠেলে নিয়ে রান্নাঘরে যেতে যেতে বিকেল বেলার বার্ধক্য এসে হাজির! আর তখনই আমরা অনেক ক্ষেত্রে বাইরের ভয়াবহ অসাস্থ্যকর চটপটা আইটেমের বিরহে কাতর হয়ে যাই।

সাহিত্য না লিখে সহজ পয়েন্টে বুঝিয়ে লিখছি কিভাবে আর কি কি বুদ্ধির বলে বিকেলের নাস্তার সময়টাতেও আমরা নিজেদের আর নিজেদের পরিবারের মন আর পেটের খুশীর খেয়াল রাখতে পারি।

Meal Planning এজন্যই খুব দরকারী। প্রয়োজনীয় সব উপকরণ আর পুস্টি মাথায় রেখে প্ল্যান করলে লাইফস্টাইল জনিত অনেক অসুখ কিচেনেই শুধরে যায় (ইনশাআল্লাহ)। আমি যদি আগের রাতেই জানি কাল আমার ঘরে কোন বেলায় কি রান্না হবে, তাহলে কিন্তু ওই শেষ বিকেলের হুটোপুটিতে আমাকে পড়তেই হয়না। মনে করি আমি রাতে কিচেন গুছিয়ে বাতি নেভানোর আগে দেখলাম কাল আমাদের নাস্তায় আছে চটপটি, রাতেই তো আমি ডাবলী ভিজিয়ে শুতে চলে যেতে পারি। সকালের নাস্তা বানানো শেষ হলে এক চুলায় চা, আরেক চুলায় মটর সিদ্ধ বসিয়ে দিলাম। আর দুপরের রান্নার ফাঁকে দুই একটা আলু আর ডিমও সিদ্ধ করে ফেললাম। আর রান্নার কুটা-কাটির সময় তো নিশ্চয়ই কিছু এক্সট্রা পেঁয়াজ, মরিচ আর ধনে পাতা কেটে নিতেই পারি। ব্যাস, সব গুছিয়ে ঠাণ্ডা করে রেখে দিলাম। বিকেলে শুধু টক গুলিয়ে নিয়ে বাটি সাজিয়ে ফেলবেন। ইচ্ছা থাকলে সপ্তাহের শুরুতে টক শরবত বানিয়ে, ফুচকা ভেজে, মটর সিদ্ধ করে ফ্রিজে/ডীপে রেখেও দিতে পারবেন। পরিকল্পনা আমাদের কষ্টের বোঝা অনেকখানি কমিয়ে দেয় কিন্তু!
এভাবে সপ্তাহের সাতদিন সাত রকমের বিকালের খাবারের চিন্তাটা  মাথায় রাখা যত বড় বোঝা মনে হয়, কাগজ-কলমে এই বোঝা নামিয়ে দিলে ততটাই হালকা লাগে।

এবার আসি, আইটেমের বিষয়ে! আমাদের বাচ্চারা আর আমাদের ঘরের বড়রা যা যা বাইরে খেতে পছন্দ করেন তার সব কিছুই কিন্তু ঘরে করা যায়।
এবার আসি বিকেলের খাবারের প্রিন্সিপাল নিয়ে, বাইরের খাবার না খাওয়া, ‘গ্লুটেন সেন্সিভিটি’র বিষয়ে খেয়াল করা, ‘লো কার্ব’ হওয়া (যেহেতু বাঙালীর বাকী তিন বেলাতেই প্রচুর কার্ব খাওয়া হয়) আর ‘সাদা চিনি’ এড়িয়ে চলা- মোটামোটি এই ব্যাপারগুলো মাথায় রাখা যেতে পারে প্রাথমিকভাবে। আলুর ফিঙ্গার ফ্রাই আমাদের/বাচ্চাদের খুব পছন্দের খাবার! সপ্তাহে একদিন এমন ফিঙ্গার ফ্রাই করতে পারি। টুইস্ট হবে আলুর জায়গায় মিষ্টি আলু, কাচা কলা বা এই ধরনের সবজি। আরেকদিন মাগ কেইক/প্যান কেইক দেয়া যায়। আটা বা ময়দায় জায়গায় আপনি রাগী পরিজ, যবের ছাতু, কোকোনাট ফ্লাওয়ার, তালবিনা বা চীনাবাদাম গুড়া দিতে পারি। সাথে একটু কোকোয়া পাউডার দিলে তো লা-জওয়াব! আর হ্যাঁ, আমি মিষ্টির জন্য চিনির থেকে জেগারী পাওডার ঘরে করে রাখতে পারি এসব নাস্তার জন্য। যদিও এটাও পুরোপুরি হেলদি না, কিন্তু সাদা চিনির থেকে ভালো অপশন। প্যানকেকের সাথে পাকা ফলও (কলা, আম) কিন্তু ভালো অপশন! দেশী খাবারের রেনেসাঁর সময় এখন! হাতে বানানো পাস্তা/নুডলস এখন ঘরে বসেই কেনা যায় কিন্তু! সেটাও হতে পারে আমার একদিনের নাস্তা। গুণবতী বোনদের হাতে বানানো গোল-গাপ্পা দেখলে আপনি কোনদিন আর বাইরের ফুচকা খাবেন না। ছোলা আরেকটা খুব জনপ্রিয় খাবার আমাদের সন্ধ্যার এই “পেকিশ” ক্ষুধার জন্য। সাথে একটু মুড়ি আর কাচা সালাদ হলে তো জমেই যায়! একদিন যেদিন দুপুরে শুধুই সবজি খাবেন সেদিন ঘরে বানানো চিকেন উইংস ফ্রাই বা নাগেটস কিংবা কিমা দিয়ে বানানো চপ খেতে পারেন। এই চপের সাথে একটু কাচা কলা সিদ্ধ করে মিশালে চোখের আর পেটের খুব লাভ হয়ে যাবে! ঘরের মানুষেরা পনির পছন্দ করলে এটা দিয়েও সালাদ, চীজ ফিঙ্গার ফ্রাইসহ আরও অনেক কিছুই করা যায়। আমার এক আত্মীয় বলেছিলেন, ডালপুরি নাকি এত মজা যে এটাকে বাংলাদেশের জাতীয় নাস্তা ঘোষণা দেয়া উচিত! আমি এই পুরিতেও চাইলে টুইস্ট আনতে পারি! ডালের পরিবর্তে ভেতরে বীট রুট/লাউ/ ঝিঙ্গা/মিস্টি আলু/কাচা কলা দিয়ে বানিয়েছি, এখনো বানাই। খুবই মজা আর প্রাকৃতিক সুইটেনিং ও হয় এগুলো দিলে। ঘরে বানানো একটু মোটা ছোট সাইজের গোল গোল রুটিকে ইচ্ছা করলে উপরে একটু সবজি আর রান্না করা গোশত দিয়ে সাজিয়ে দিয়ে তাওয়ায় পিজা করে দিতে পারি একদিন। আর ওভেন থাকলে তো সেখানেই করা যাবে। সব রকমের ডাল গুড়া করে হালিমের প্রস্তুতি মাসের শুরুতে নিয়ে রাখলে এটা থেকেও বঞ্চিত হবেন কেন? এককাপ বুটের ডাল আর সাথে একটু পোলাও চাল দিয়ে বেসন বানিয়ে ঘরে রাখলে মাঝে মাঝে একটু পাকোড়াও হতে পারে!

অনেক আইটেমের কথা বললাম। আসলে এমন লিখলে আরও অনেক আইটেমের কথা লিখা যাবে। সবচেয়ে ভালো হবে আমি যদি আমার পরিবারের পছন্দ, স্বাস্থ্য, আমার সুযোগ-সুবিধা আর সর্বোপরি আমার পরিবারের সামর্থ্য মাথায় রেখে আমি নিজেই যদি এই প্ল্যানিং এ বসি। আর একবার প্ল্যান করে নিলে তো অন্তত ছয়মাস আর চিন্তা নেই। একঘেয়ে লাগলে কিছুদিন পর পর না-হয় চেঞ্জ করে নিলাম।

ঘরের খাবার অভ্যস্ততায় আমাদের কি কি লাভ হয় আশা করি সেটা এখনকার সময়ে কাউকে বলে বোঝাতে হবেনা। শুধু ঘরের খাবারের অভ্যাস বদলে ফেলে কত মানুষ এখন দীর্ঘদিনের ওষুধের কৌটা সাহসের সাথে ফেলে দিচ্ছেন সেই গল্পগুলোও আমাদের জানা! অনেকেই আমাকে বলেন এত খাঁটি জিনিষ কেনার খরচ বেশী হয়, কিন্তু আমার মনে হয় অপ্রয়োজনীয় অনেক খরচ আমরা করি যেগুলর হিসাব মিলালে নিজেরাই নিজেদের এই যুক্তিতে হাসবো। ঘরের আপন মানুষগুলো যখন দিনের পর দিন আমার হাতের ঘরের খাবারের আভিজাত্যে মশগুল হয়ে বাইরের কিছু দেখে ভালো পেট নষ্ট হবে বলে খায়না- তখনকার আনন্দটা কিন্তু অপার্থিব!

Facebook Comments
পোস্টটি ৬৪৩ বার পঠিত
 ০ টি লাইক
১ টি মন্তব্য
একটি মন্তব্য করা হয়েছে

আপনার মুল্যবান মন্তব্য করুন

Facebook Comment